কৃষি কাজ করে নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন ঈশ্বরদীর নুরুন্নাহার

0
1530

কৃষি কাজ করে নিজের ভাগ্য বদলে দিয়ে সারাদেশে ঝড় তুলেছেন নুরুন্নাহার। মাত্র ২০ হাজার টাকায় শুরু করেছিলেন কৃষি কাজ। তিনি এখন রীতিমতো কোটিপতি। শুধু তাই নয়, তিনি এখন বাংলাদেশের কৃষি উন্নোয়নের রোল মডেল। কৃষিতে বিপুল অবধান রাখায় পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। নিজের ভাগ্য ফিরিয়েই তিনি ক্ষান্ত হন নি। তিনি এখন এক হাজার নারীর ভাগ্য বদলে দিতে চান।

 

 

আর দশজন গ্রাম্য বধুর মতো চার দেয়ালের গণ্ডির মধ্যে নিরিবিলি জীবন যাপন করার কথা থাকলেও নুরুন্নাহার ব্যতিক্রম। অদম্য স্পৃহা ও প্রবল সাহসের মাধ্যমে তিনি এখন একজন সমাজ উন্নয়ন কর্মী, নারী উদ্যোক্তা ও সফল কৃষক। নারী কৃষক হিসেবে নুরুন্নাহার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি স্বর্ণ পদকও লাভ করেছেন।

পাবনার ঈশ্বরদীর ছলিমপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম বিশ্বাসের স্ত্রী নুরুন্নাহার। নিবিড় সবজি, ফলমূল, পোল্ট্রি ও গাভির খামার করে এলাকার নারীদের কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। দেশের সকল নারী কৃষককে ডিঙ্গিয়ে ২০১০ সালে সিটি গ্রুপ জাতীয় পুরষ্কার জেতেন তিনি। সে সময় নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকা একটি সার্টিফিকেট এবং একটি ২৪ ইঞ্চি রঙ্গিন টেলিভিশন পুরষ্কার তাকে দেয়া হয়।

২০১১ সালে দেশের সেরা নারী কৃষক হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি ব্রোঞ্জ পদক, ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি স্বর্ণ পদক ও ২০১৭ সালে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নগদ ১ লাখ টাকাসহ মাছরাঙ্গা অ্যাওয়ার্ড পেয়ে তিনি দেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দেন। জয়বাংলা নারী উন্নয়ন মহিলা সমবায় সমিতি ও এনসিডিপি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভানেত্রী নারী উদ্যোক্তা নুরুন্নাহার ১ হাজারের বেশি নারীদের সংগঠিত করে তাদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

নুরুন্নাহার জানান, স্বামী কাজে বেরিয়ে গেলে অলস বসে থাকা তার ভাল লাগত না। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে তারও ইচ্ছে জাগে বসতবাড়ির আশপাশে শাক-সবজি ও ফলমূলের বাগান গড়ে তোলার। এরপর আর থেমে থাকেনি নুরুন্নাহার। লালশাক, পুঁইশাক, বেগুন, গোল আলু, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ, যা কিছু তিনি বাড়ির আঙ্গিনায় চাষ করেন, তা দিয়েই সারা বছরের সবজির চাহিদা মিটে যায়। এমনকি বাড়তি কিছু আয়ও হয়। প্রথম প্রথম স্বামী তার এমন কর্মকাণ্ডে কিছুটা বিরক্ত হতেন বলে জানান তিনি।

২০০৫ সালে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, জাকির হোসেন ও আব্দুর রশিদ নুরুন্নাহারের এলাকায় ব্র্যাক এনসিডিপি’র মহিলা গ্রাম কমিটি গঠনের পর তাকে দায়িত্ব দিয়ে যান। এতে করে তার স্বামীর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় এবং বাড়ি সংলগ্ন ৫ বিঘা জমিতে ফুলকপি, বাধাকপি, ওলকপি, গাজর, ইত্যাদি ফসলের আবাদ করে আশাতীত লাভবান হন। পরের বছর ৩১ আগষ্ট ঋণ পরিশোধ করে দ্বিতীয় বারের মত ২০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন।

এ অবস্থায় তিনি জানতে পারেন বড়ইচারা দণিপাড়ায় ছিদ্দিকুর রহমান ময়েজের কূল চাষ প্রকল্পের কথা। ময়েজের কাছ থেকে চারা কিনে এনে নুরুন্নাহার ১৭৫টি গাছের একটি কূলের বাগান গড়ে তোলেন। প্রথম বছর কূল বিক্রি করে তিনি ২৫ হাজার টাকা আয় করেন। এছাড়া উন্নত জাতের পেয়ারার (৪০)টি গাছও লাগান আঙ্গিনায়।

বর্তমানে তার খামারে ১০০টি গরু ও ৪ হাজার সোনালী মুরগী রয়েছে। এ ছাড়া তিনি ২ বিঘা ড্রাগন, ৭ বিঘা পেয়ারা, ৬ বিঘা লিচু, ৫ বিঘা পেঁপে, ২ বিঘা কলা, ৪ বিঘা লাউ, ৪ বিঘা ফুল কপি, ৪ বিঘা পেঁয়াজ, ৩ বিঘা রসুন, ১ বিঘা টমেটো, ৩ বিঘা বেগুন, ৩ বিঘা মটর, ২ বিঘা গম, ৪ বিঘা আলু, ২০ বিঘা মশুর চাষ করছেন। এনসিডিপি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভানেত্রী নুরুন্নাহারের স্বামী রবিউল ইসলাম বিশ্বাস পেশায় একজন ব্যবসায়ী। জয়নগরের চাউল কল মোকামের একটি মিলে ধান চাউলের ব্যবসা করেন তিনি।

ধীরে ধীরে নুরুন্নাহারের জয়-জয়কার ছড়িয়ে পড়ে গোটা পাবনা জেলায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নুরুন্নাহারের কাছে কৃষি কাজের পরামর্শ নিতে যান। নুরুন্নাহারও তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেন তার সফলতার দিকগুলো। নুরুন্নাহার তার গ্রামের ২০০ নারীকে হাতে কলমে কৃষি কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

২০১১ ও ২০২৬ সালে দেশের সেরা নারী কৃষক হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক পেয়ে তিনি দেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দেন। নুরুন্নাহারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সফল নারী উদ্যোক্তা ও নারী কৃষক নুরুন্নাহারের হাতে তুলে দেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রওশন জামাল বলেন, ‘নুরুন্নাহার বেগম পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যাবসায়, সাহস ও মেধাকে কাজে লাগিয়েছেন। সংগ্রাম ও সাহসের মধ্য দিয়ে কৃষি খামার করে তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ও খামারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। পরিশ্রম মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায় তার বাস্তব প্রমাণ হলো নুরুন্নাহার কৃষি খামারের স্বত্তাধিকারী কৃষাণী নুরুন্নাহার বেগম। কঠোর পরিশ্রম করে নুরুন্নাহার বেগম একজন মডেল খামারী হিসেবে ইতোমধ্যে ঈশ্বরদীতে পরিচিতি লাভ করেছেন।

নুরুন্নাহার বেগমের সফলতা দেখে ছলিমপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের নারীরাও রীতিমতো প্রতিযোগিতামূলক কৃষি কাজে এগিয়ে এসেছেন। পরিশ্রম, ধৈর্য্য, অধ্যাবসায়, সাহস ও মেধাকে কাজে লাগাতে পারলে নুরুন্নাহার বেগমের মতো সকলেই এক সময় সফল হয়ে উঠবেন বলে আশা করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*