সীমান্তে বিএসএফ’র একতরফা রাজত্ব!

মীর আব্দুল আলীম// সীমান্তে হত্যা বন্ধের আশ্বাস সবই যেন গরল ভেল! প্রতিশ্রুতির পুরোটাই যেন প্রহসন! বারবার বাংলাদেশি নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। সীমান্তে যেন বিএসএফ’এর রাজত্ব! চোরাচালানের অজুহাতে বিএসএফ নির্বিচারে বাংলাদেশীদের হত্যা করলেও; বিজিবি ভারতীয়দের গাঁ ছুঁয়ে দেখারও সাহস পাচ্ছে না। চোরচালানে কেবল বাংলাদেশীরা নয়, ভারতীয়রাওতো জড়িত? তবে কেন কেবল বাঙ্গালী খুন হয়? তবে কি ওরা (ভারতীয়রা) মানুষ; আর আমরা (বাংলাদেশি) কুকুর, বিড়াল? সীমান্ত হত্যা বন্ধে দু’দেশীয় বৈঠক হয় কিন্তু সীমান্তের রক্তপাত কিছুতেই বন্ধ হয় না। ফিবছর ধরে আমরা শুধু ভারতের বলির পাঁঠা হয়েই রইলাম। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যন্ত কারো অঙ্গীকারই ঠিক থাকছে না। সীমান্ত হত্যাকান্ড বন্ধে তাদের প্রতিশ্রুতি ঠিক থাকে না কখনই। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত প্রতিনিয়তই বাংলাদেশি নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর লালমনিরহাটের আদিতমারীর দুর্গাপুর সীমান্তের চওড়াটারি গ্রামে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় বিএসএফ। এতে একজন ঘটনাস্থলে, অপর একজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আহত হন আরও চারজন। ৬ অক্টোবর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউড়ের গড় সীমান্ত থেকে দুই কিশোরকে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। পরদিন ৭ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হন। একই দিন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দু’জন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে বিভিন্ন ভারতীয় সীমান্তে ১ হাজার ৩৫ জন বাংলাদেশি নিহত ও ৯১৯ জন আহত হন। যুদ্ধাবস্থা ছাড়া বন্ধুভাবাপন্ন দুই দেশের সীমান্তে এরকম প্রাণহানি অস্বাভাবিক, অমানবিক। সীমান্তে হত্যাকান্ড নতুন কোন ঘটনা নয়। ঘটছে, ঘটবে, যেন এটাই স্বাভাবিক। কোন কিছুই মানছে না ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী। বিধিনিষেধ, পতাকা বৈঠক বা প্রতিবাদকে তোয়াক্কা না করে সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর হিংস্র আচরণ করছে এ বাহিনী। বর্তমানে বাঙালিদের পশুপাখির মতো গুলি করে হত্যা করে নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছে। ভারত সরকার বিভিন্ন সময় সীমান্তে হত্যা বন্ধ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও ভারত সরকার সীমান্তের বিএসএফ জোয়ানদের লেলিয়ে দিচ্ছেন ঠিকই। দু’দেশীয় পতাকা বৈঠক শেষ না হতেই বাঙালি হত্যা করে লাশ উপহার দিচ্ছে বাংলাদেশকে। সীমান্তে পৌনঃপুনিক বাংলাদেশি হত্যার দায়ভারটা শেষ বিচারে কিন্তু গিয়ে পড়ে ভারতের রাজনৈতিক সরকারের ওপরই; কারণ নির্দেশটা সেখান থেকেই আসছে। দেখামাত্র গুলি এমন নির্দেশ অবশ্যই আছে, তাই বিএসএফ ন্যূনতম অপো না করে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষগুলোকে এভাবে হত্যা করছে। তাহলে এটা ধরে নেয়া কি খুব ভুল হবে, হাজার মৌখিক আশ্বাস থাকলেও ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রয়েছে বলেই সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা অব্যাহত রয়েছে। কারণ বিএসএফের মতো একটা রেজিমেন্টেড বাহিনীর দায়িত্বই হলো অরে অরে উপরের নির্দেশ পালন করা। সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধের ব্যাপারে আগের নির্দেশটি প্রত্যাহার করতে হবে, সেটা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যত প্রতিশ্রুতিই দেয়া হোক সীমান্ত হত্যা চলতেই থাকবে। অর্থাৎ সত্যিকারভাবে ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না পাল্টালে সীমান্তে এভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা বন্ধ হবে না। বৈঠক আলোচনায় লাভ হয়নি কখনোই। ওরা (বিএসএফ) মানুষ মারলে মিনমিনে প্রতিবাদ হয় মাত্র। আর বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) কোন কারণে কোন ভারতীয়কে হত্যা করেছে তো আর রা নেই। জোর প্রতিবাদ হয়; হুঙ্কার ছাড়ে। স¤প্রতি সময়ে বিএসএফের গুলিতে অনেক নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা বর্ণনা দেয়া যাবে কিন্তু কয়টার বর্ণনা দেব এ স্বল্প পরিসরে। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৪ বছরে সীমান্তে বিস্তর হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বিএসএফ। প্রায় দিনই কোন না কোন সীমান্তে রক্তপাত যেন স্বাভাবিক ঘটনা। ইতিপূর্বে ফেলানি নামের একজন কিশোরীকে বিএসএফ হত্যার পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখলে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। তারপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ঢাকা আসেন। তাদের সঙ্গে বৈঠকে সীমান্তে হত্যার বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হলে তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আশ্বাস দেন যে, সীমান্তে হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। সীমান্তে কোন কোন স্থানে বিএসএফ ও বিজিবি মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না। অর্থাৎ গুলি না চালিয়ে রাবার বুলেট জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করবে। আশ্বাসের পরও সীমান্তে গুলি শুধু চলছেই না, একদিনে একসঙ্গে চার স্থানে গুলি চালিয়ে চার বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। বর্তমান সরকারের সময়ে ভারতকে নিরাপত্তা ও ট্রানজিটের েেত্র কতিপয় একতরফা সুবিধা দেয়ার পর দু’দেশের সম্পর্ক খুবই নিবিড় আছে বলে দাবি করা হলেও সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকান্ড পরিচালনা, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া এবং টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের মতো ঘটনায় সুসম্পর্কের কোন প্রতিফলন নেই। মহাজোট সরকার মতায় আসার পর সবাই মনে করতে থাকে এবার হয়তো সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে। কিন্তু তা না হয়ে উল্টো হয়েছে। এ সরকারের সময় সীমান্তে পশুর মতো হত্যা করা হয়েছে বাঙালিদের। সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা বন্ধ হয়নি কখনোই। ভারতের নীতিনির্ধারকদের কূটকৌশলে বারবার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। অথচ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ভারত একটি উদীয়মান শক্তি। বাংলাদেশের মতো একটি ুদ্র রাষ্ট্রের পরে এত শক্তিশালী প্রতিবেশীকে মোকাবিলা করা কঠিন। তাই সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপন করা। এজন্য আমাদের নীতিনির্ধারক মহলের আরও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ দাবি জানিয়ে আসছে। এ নিয়ে কতবার যে পতাকা বৈঠক হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এরপর বিডিআর (বিজিবি)-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে ঢাকা-দিলি­তে। প্রতিবারই বিএসএফ মহাপরিচালক স্পষ্ট ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সীমান্তে আর হত্যাকান্ড হবে না। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি এতটাই প্রহসনমূলক ছিল যে, প্রতিবারই তার ঘোষণার ক’দিন পরই আবার বিএসএফের গুলি চলেছে এবং নিহত-আহত হয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিক। অতঃপর ফেলানির গুলিবিদ্ধ লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার সচিত্র সংবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। একপর্যায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকান্ডের পুনরাবৃত্তি হবে না বলে জানালেন। বিএসএফ কর্তৃপ বড়জোর চোরাই ব্যবসা বন্ধ করতে রাবার বুলেট ছোড়া হবে বলে জানাল। আশা করা গিয়েছিল, অন্তত হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা আর ঘটবে না সীমান্তে। অবশেষে সবই গরল ভেল! ভারত বাংলাদেশের বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের ৩০টি সীমান্তবর্তী জেলা ভারতের সঙ্গে রয়েছে। এসব জেলা দিয়ে দুই দেশের মানুষের বিনা পাসপোর্টে যাতায়াত রয়েছে। প্রতিদিন দুই দেশের হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পরিবার-পরিজন বা নিকট আত্মীয়স্বজনের কাছে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ সীমান্তে যে নির্যাতনের হলি খেলায় মেতে উঠেছে তাতে সে দেশের সচেতন মহল, মানবাধিকার সংগঠন, বুদ্ধিজীবীদেরও হতবাক করেছে। তারা সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জিরো পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশিদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, হত্যা করছে। শুধু হত্যা ও আহত করাই নয়, বিএসএফ বরাবরই সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে নানা ধরনের দুষ্কর্মে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ভূখন্ডে ভারতীয়দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে চাষাবাদ, সীমান্ত পিলার ভাঙা, নদী থেকে জোর করে মাছ লুট, বাংলাদেশ এলাকায় নদীতে জেগে ওঠা চর জবরদখল ইত্যাকার অনৈতিক কাজে তারা লিপ্ত ছিল, আছে। স¤প্রতি তার আর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে সীমান্ত এলাকায়। বস্তুত, ভারত আগাগোড়াই বাংলাদেশকে দেয়া কোন অঙ্গীকার রা করছে না। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, তিস্তা চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ থেকে শুরু করে সীমান্ত হত্যাকান্ড, বাংলাদেশের ভূখ- বিনা উসকানিতে অনুপ্রবেশ, সব েেত্রই মুখে এক, মনে অন্য। এসব ব্যাপারে বর্তমান সরকারের ভূমিকাও স্বচ্ছ নয়। ভারত যা খুশি করে পার পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার দেশবাসীর চাপের মুখে যতটা প্রতিবাদ করছে তা এতই মৃদু যে, ভারত তোয়াক্কাই করছে না। সরকারের এই ‘দেখি না কী হয়’ নীতি ক্রমেই দেশবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে বাড়িয়ে তুলছে। আমাদের প্রত্যাশা, সীমান্ত হত্যাকান্ডসহ অন্যান্য ভারতীয় অনৈতিক পদেেপর বিরুদ্ধে সরকার এবার লাগসই ও টেকসই ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়াস চালাবে। প্রয়োজনে আরও বৈঠক করতে হবে। ভারত সরকরকে বোঝাতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও নিতে হবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে এ েেত্র ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তরিক হবে কিনা? এজন্য আমরা ভারতের রাজনৈতিক শুভবুদ্ধির প্রত্যাশা করি। আমরা মনে করি, সীমান্তে সৌহার্দ-স¤প্রীতির পাশাপাশি বিএসএফের বেআইনি হত্যাকান্ড বন্ধে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জরুরি। উভয় দেশের শান্তি রার্থে এবং সীমান্ত অপরাধ দমন করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক সৌহাদ্যের কোন বিকল্প নেই। আর এই কাজে ভারতকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে।

মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, লেখক, গবেষক।

স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৪ বছরে সীমান্তে বিস্তর হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বিএসএফ। প্রায় দিনই কোন না কোন সীমান্তে রক্তপাত যেন স্বাভাবিক ঘটনা। ইতিপূর্বে ফেলানি নামের একজন কিশোরীকে বিএসএফ হত্যার পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখলে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। তারপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ঢাকা আসেন। তাদের সঙ্গে বৈঠকে সীমান্তে হত্যার বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হলে তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আশ্বাস দেন যে, সীমান্তে হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। সীমান্তে কোন কোন স্থানে বিএসএফ ও বিজিবি মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না। অর্থাৎ গুলি না চালিয়ে রাবার বুলেট জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*