পদ্মার ইলিশ : দাদারা পাচ্ছে দাদারা খাচ্ছে!

0

মীর আব্দুল আলীম// ভর মৌসুমেও দেশের সাধারণ মানুষ ইলিশ খেতে পারছে না। কোনোভাবেই ইলিশের দাম কমছে না। বাজারেও ইলিশ পর্যাপ্ত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের পরও নদীতে সাগরে দেশে প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। মৌসুমভেদে হয়তো কম-বেশি। এবার একটু কম। তবে বাজারে যে পরিমান ইলিশ যাচ্ছে ততটা কম নয়। তাহলে ইলিশ কোথায় যাচ্ছে? দেশের মানুষের কাছে ইলিশ সহজলভ্য করতে এর আগে পাশের দেশ ভারতেও ইলিশ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছে। ভারতে ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে না। তাহলে দেশে ইলিশ অপ্রত্যুল কেন? ইলিশের ভর মৌসুমেও ইলিশের দাম আগুন কেন? ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার একটি শিরোনাম এমন-‘রসনার আবেগে হার মানছে আইন, চোরাপথে বাংলা ইলিশ’। ঐ প্রতিবেদনেই সকল প্রশ্নে জবাব মিলে। তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও যশোরের একাধিক সীমান্ত এলাকা থেকে চোরাইপথে অবাধে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকছে বাংলাদেশের ইলিশ। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে ধরাপড়া ইলিশের দুই-তৃতীয়াংশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাই বাঙ্গালীর সোনালী ইলিশ এখন দাদারা পাচ্ছে! দাদারাই খাচ্ছে বেশী বেশী! ইলিশের পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না কিছুতেই। ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও মনে হয় না। তাই সোজা পথে না গিয়ে বাঁকা পথেই ভারতের দাদাদের কাছে ইলিশ পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে এদেশের মানুষের কাছে ইলিশ এখনও দুর্লভ্যই রয়ে গেছে। একটি ইলিশ এখন ৫শ’ থেকে ৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। যা দেশের মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র মানুষের জন্য সুসংবাদ নয় মোটেও। পত্রিকার খবরে দেখি রাতে ধরা পরে শত শত টন ইলিশ। রাত শেষে সকাল হলেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে এসব ইলিশ। তাহলে কোথায় যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে ইলিশ সংশ্লিষ্ট সবাই বলেছেন, অবৈধ পথে সব পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পত্রিকার খবরে আরও জানতে পারি যশোর-সাতক্ষীরার যেসব অব্যবহৃত সীমান্ত পথ এতোদিন ঝোপ-জঙ্গলে ভরে ছিল সেসব এখন ইলিশ পাচারের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র ইলিশ রফতানি বন্ধ থাকায় চোরাইপথে ইলিশ ঢোকার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কেউই এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না। অন্যদিকে বিজিবিও ইলিশ পাচার রোধে তেমন তৎপর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মৌসুমের শেষ দিকে ইলিশ ধরা পড়লেও সিংহভাগ পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। রাতের অন্ধকারে ঢাকা-বরিশাল-খুলনা ও চাঁদপুর থেকে যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্তে চলে যাচ্ছে ইলিশ। যশোরের পুটখালীর ইছামতী নদীর ওপারেই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত গ্রাম আংরাইল। বেশি ইলিশ যাচ্ছে ওই পথেই। এ ছাড়া যশোরের সাদিপুর হয়ে ভারতে জয়ন্তীপুর-গাঁতিপাড়া এবং সাতক্ষীরার ভোমরা-কালীগঞ্জ হয়ে ঘোঁজাডাঙা সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকছে হাজার হাজার টন ইলিশ। রপ্তানির অনুমতি না থাকায় আড়তে না এসে চোরাই পথে ভারতে ইলিশ পাচার করছে ব্যবসায়ীরা। ফলে বড় আকারের ইলিশ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায়ই বিজিবির হাতে ধরা পড়ছে বড় বড় চালান। এতো বেশি ইলিশ ভারতে পাচার হচ্ছে যে এখন আমাদের দেশের ইলিশ ভারতেই কমদামে মিলছে। পদ্মার ইলিশ আমদের দেশের চেয়ে ভারতে দাম কম কেন? ১ থেকে দের কেজি পদ্ধার ইলিশ কি আমাদের দেশে ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় পাওয়া যায়? আমার মনে হয় যায় না, আমাদের দেশে বর্তমানে ১ কেজি ওজনের ১টি ইলিশ কিনতে গেলে বর্তমান সময়ে মিনিমাম ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা লাগে। আর ভারতে তা মিলছে বাংলাদেশী টাকায় ৪০৮ টাকায়। এ ইলিশ পাচারে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রশ্রয় দিচ্ছে, এমন অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। সীমান্তে গরু পাচারের সময় বিএসএফ প্রায়ই গুলি করে চোরাচালানিদের লক্ষ্য করে। ইলিশ পাচারের সময় এমন প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হচ্ছে না চোরাচালানিদের। বৈধভাবে ইলিশ রপ্তানি হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। চোরাচালান হওয়ায় সে সুযোগ থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো ইলিশের বিনিময়ে মাদকসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান আসছে সীমান্ত ডিঙিয়ে। কেবল ভারতে ইলিশ পাচার হয়ে যাচ্ছে তা নয়। গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ইলিশের গতিধারা পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের মতে, বিজ্ঞানের ভাষায় ইলিশ এক ধরনের অ্যানাড্রোমাস মাছ। জীবনের অধিকাংশ সময় তারা সমুদ্রে কাটায়। তবে ডিম ছাড়ার মৌসুমে উজান ঠেলে নদীতে চলে আসে। প্রথম দিকে ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদ্মা ও মেঘনায় প্রবেশ করত। পশ্চিম ধরে গঙ্গার দিকেও এগোতো। তবে বাংলাদেশের নদীগুলোতেই এগুলোর ছিল অবাধ বিচরণ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের জলসীমায় এগুলোর বিচরণ কমে যাচ্ছে এবং ভারতীয় জলসীমার দিকে এগুলোর যাতায়াত বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইলিশ একসময় ফারাক্কা হয়ে চলে যেত উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত। ফারাক্কা বাঁধের কারণে সে পথ এখন অনেকটা রুদ্ধ। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সীমার কাছে সাগরে ডুবোচরের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু ইলিশ মুক্ত পানি পছন্দ করে। ফলে এগুলো বাংলাদেশের পানি ছেড়ে চলে যাচ্ছে ভারতের জলসীমায়। ভভা ইলিশের বড় আবাস পদ্মার পানি শুকিয়ে যাওয়াকে এ মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। ১৯৭৫ সালে শুকনো মৌসুমে (এপ্রিল-জুলাই) পদ্মায় পানিপ্রবাহ ছিল ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার কিউসেক। ফারাক্কা বাঁধের কারণে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এ প্রবাহ ৩০ হাজার কিউসেকে নেমে আসে। আর এটি বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। শুধু ইলিশ নয়, দূষণের কারণে নদীগুলোতে অন্যান্য মাছও কমে যাচ্ছে। একসময় চট্টগ্রামের নদীগুলোতে ৭০টির বেশি প্রজাতির মাছ ছিল। আর দূষণের ফলে কমতে কমতে এখন সেখানে ১০টি প্রজাতিও খুঁজে পাওয়া ভার। ইলিশ নোনা পানির মাছ। বাংলাদেশের মৎস্য-প্রোটিনের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ পূরণ হয় ইলিশ মাছ থেকে। নোনা পানির মাছ হলেও এরা প্রজননকালে উজানে মিঠা পানিতে গিয়ে স্রোতপ্রবাহে ডিম ছাড়ে। যেমন-পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অন্য নদীগুলো এদের প্রজননস্থল। অবাধ ভাসমান ডিম থেকে রেণু বেরিয়ে এসব এলাকায় কিছুদিন থাকে, এখানেই খায় এবং বড় হয়। ছয় থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে এরা ১২-২০ সেমি লম্বা হয় এবং জাটকায় রূপ নেয়। আরও বড় হয়ে এরা ভাটিতে নামতে থাকে এবং সমুদ্রে চলে যায়। একসময় ইলিশ বাংলাদেশের রাজশাহী হয়ে ভারতের এলাহাবাদ পর্যন্ত বিচরণ করত। পৃথিবীতে যত ইলিশ উৎপাদিত হয়, প্রায় তার সবটাই বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই থেকে আড়াই মিলিয়ন জনগোষ্ঠী ইলিশ উৎপাদন হতে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ঝাটকা নিধন বন্ধ করতে হবে। ইলিশ ডিম ছাড়ার সময় ও প্রজননের সময় মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে মৎস্যজীবীদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিলেই জাটকা ধরা বন্ধ হবে এবং এর ফলে অতিরিক্ত প্রায় ১০/১২ লাখ টন বেশি ইলিশ আহরণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন প্রয়োজন। ইলিশ আহরণের সময় মৎস্যজীবীদের আনুমানিক প্রায় ১০০০ কোটি টাকার খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিলে জাটকা নিধন প্রায় ৮০/৯০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে এবং পক্ষান্তরে আরও প্রায় ১০/১২ লাখ টন বাড়তি ইলিশ মাছ ধরা যাবে, যার মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ৫০ হাজার কোটি টাকা দেশের বাড়তি আয় হলে জিডিপি ১ থেকে দেড় শতাংশ বাড়তে পারে বলে এনবিআর ও ইআরডি সূত্রে জানা যায়, যদিও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশের এবারের জিডিপি ৬.২০ থেকে ৬.২৫ শতাংশ হবে বলে আগাম ধারণা করছে। কিন্তু মৎস্য খাত থেকে আর ৫০ হাজার কোটি টাকা ‘দেশজ-আয়’ হলে জিডিপি আরও ১ থেকে দেড় শতাংশ বাড়বে বলে ধরে নেওয়া যায়। দেশি বা বিদেশি ‘জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল’ থেকে ১০০০ কোটি টাকা নিয়ে জাটকা নিধন বন্ধ ও মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসন করা যায়। কথায় আছে, মাছে ভাতে বাঙালি। মাছ বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের একটা প্রধান অনুষঙ্গ। অন্যদিকে মাছ বাঙালি সংস্কৃতির অংশও। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ, কিংবা পরিবারের খাবারের মেন্যুতেও ইলিশ একটা খুবই প্রয়োজনীয় খাবার। আর যদি আপনি বৈশাখের কথা বলেন, তাহলে তো ইলিশ ছাড়া চলবেই না। ইলিশকে কেন্দ্র করেই রমনার বটমূলের বৈশাখ বরণ উৎসবের সবচেয়ে বড় আয়োজন পান্তা-ইলিশের দোকান বসে। ইলিশভাজার সঙ্গে পান্তাভাত। বাংলার রসুইঘরে কত রকমের ইলিশ যে রান্না হয়। সরিষা ইলিশ, দই ইলিশ, পুদিনা ইলিশ, কচু ইলিশ, পটল ইলিশ আর ডুবা তেলে ভাজা ইলিশের পেটি তো আছেই। একসময়ের সেই ইলিশের সুদিন আর নেই। দিনে দিনে ইলিশের প্রজনন দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আগের মতো আর ইলিশ পাওয়া যায় না। যাও মিলে তা বাঙ্গালীর ভাগ্যে জোটে না; এর একটা বড় অংশ পাচার হয়ে যায় পাশের দেশ ভারতে। ইলিশের এ অবাধ পাচার বন্ধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা। আর সরকারকে সহসাই তা দক্ষতার সাথে করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।