প্রথম আলো’র মতবিনিময় সভা প্রসঙ্গে: মোশাররফ হোসেন মুসা

যেভাবেই হোক ‘প্রথম আলো’ মধ্যবিত্ত সমাজে একটি শক্ত অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। স্বাভাবিক কারনেই বড় দলগুলো চায় ‘প্রথম আলো’ তাদের পক্ষে থাকুক। প্রথম আলোর বক্তব্য তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকায় তাদেরকে বিভিন্ন চাপের মধ্যে থাকতে হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষের একজন বুদ্ধিজীবি বহু আগে থেকেই বলে আসছেন ‘প্রথম আলো একটি বর্ণচোরা পত্রিকা। … …পত্রিকাটি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।’ ‘প্রথম আলো’ তার পাঠক প্রিয়তা ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় তারা বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় লোকদের সঙ্গে মত বিনিময় করা শুরু করেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর’১৫ তারিখে ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা মিলনায়তনে দুটি মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। আমি বিকালের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থাকি। সম্পাদক সাহেব দর্শকের উদ্দেশ্যে বলেন-‘আপনারা প্রথম আলোতে কি চান ? আপনাদের এলাকার সমস্যাগুলো কি ? এগুলো প্রথম আলো সঠিকভাবে ছাপছে কি না, প্রথম আলোর বিরুদ্ধে আপনাদের কোন অভিযোগ আছে কি না, এ বিষয়ে আমরা আপনাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চাই। … … আমরা দু’ঘন্টার মধ্যে আলোচনাটি শেষ করবো। সেজন্য আপনারা দু’মিনিটের মধ্যে নিজ নিজ বক্তব্য শেষ করবেন।’ ৭-৮জন বক্তা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তব্যে ঈশ্বরদীতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না থাকা, ঈশ্বরদীতে শাক-সবজি ও ফল সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকা, ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি না থামা, ঈশ্বরদী পৌর এলাকার রাস্তা-ঘাটগুলো সংষ্কার না করা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ ছিল। সম্পাদক সাহেবের মুখভঙ্গি প্রমাণ করে বক্তাদের বক্তব্যগুলো সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই অবগত আছেন। দর্শকদের সন্তুষ্টির জন্যই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছেন মাত্র। এখানে উল্লেখ্য, বক্তব্যগুলোকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। তাহলো, স্থানীয় সমস্যা আর জাতীয় সমস্যা। সাধারণত স্থানীয় সমস্যাগুলো দূর করার জন্য স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সমস্যাগুলো দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা থাকে। সেজন্য দাবীগুলো সেভাবে উত্থাপন হওয়া উচিত। কিন্তু সকলেই শুধু চাই-চাই করলেন, দাবীগুলো কে বাস্তবায়ন করবেন এবিষয়ে কারোর কোন বক্তব্য ছিল না। আধুনিক সংবাদপত্রের দায়িত্ব শুধু সংবাদ পরিবেশনই নয়, সচেতন নাগরিক শ্রেণী গড়ে তোলাও সংবাদপত্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংবাদপত্রগুলোতে সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে কার্যত কোনো ‘স্থানীয় সরকার’ ব্যবস্থা নেই। সকল কাজ করার জন্য রয়েছে একাধিক কর্তৃপক্ষ। এসব কর্তৃপক্ষকে আবার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে দূরবর্তী কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, একাধিক কর্তৃপক্ষ আর দূবরর্তী কর্তৃপক্ষ কোন কাজের কর্তৃপক্ষ নন। পূর্বে আমাদের পাঠ্যপুস্তুকে আবেদন পত্র লেখার নিয়ম শেখানোর জন্য প্রশ্ন ছিল- একটি নলকুপ চেয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে দরখাস্ত লিখ। বর্তমানে সে আবেদন পত্র করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ সদস্যের বরাবরে (নামটি হওয়া উচিত স্থানীয় সংসদ সদস্য)। সেজন্য আমাদের চাওয়াগুলো যেন সঠিক ও সুস্পষ্ট হয় এ বিষয়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা থাকা উচিত। এ বিষয়ে সিডিএলজি’র বক্তব্য হলো এদেশের আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদির বিবেচনায় দু’প্রকারের সরকার ব্যবস্থা-তথা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থাই সমাধান দিতে পারে। সে ব্যবস্থায় জেলা সরকারগুলো এক হাতে নগর সরকার ও অন্য হাতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারগুলো নিয়ন্ত্রন করবে। কেন্দ্রের সাথে শুধু জেলার সম্পর্ক থাকবে।

লেখক: গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক।

পাঠকের প্রতিক্রিয়া :
দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর’১৫ তারিখে প্রকাশিত ‘প্রথম আলো’র মতবিনিময় সভা প্রসঙ্গে’ শীর্ষক লেখাটি পড়লাম। যতখানি বুঝলাম, না-বুঝতে পারার পাল্লা হল তার চেয়ে ভারি। লেখক ঠিক কী বুঝাতে চেয়েছেন তাই বুঝলাম না। ‘প্রথম আলো’ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে যাচ্ছে। সম্ভবত লেখক প্রথম আলো’র এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দ্বিমত পোষন করছেন এবং তিনি প্রথম আলো’র কাছে বিকেন্দ্রিকরণ ব্যবস্থার পক্ষে মতামত চাচ্ছেন।
বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র, ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রন বেশি হয়। তার উপর বাংলাদেশে কখনোই গণতন্ত্রের ন্যূনতম চর্চা হয়নি, করতে দেয়া হয়নি। এখানে গণতান্ত্রিক শক্তি না পেরেছে বিকশিত হতে, তা সে চেষ্টা করেছে কখনও। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে একক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত। সামষ্টিক শাসনের সামান্যতম উদ্যোগ চোখে পড়ে না। আমাদের সংবিধান নিয়ে আমরা বাগাড়ম্বর করি, কিন্তু তার ছত্রে ছত্রে একক কর্তৃত্বের নির্ঘোষ। আমার জানা মতে, একমাত্র হুসেন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া বাংলাদেশকে কোন দলই ফেডারেল রাষ্ট্র করার কথা বলে না। একটি জাতীয় ঐক্যমত, নিদেনপক্ষে রাজনৈতিক দাবি ছাড়া তা অর্জিত হবে না। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল Ñ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি Ñ ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থা চায় না। আপনারা যে আমজনতার দল কিংবা দেশপ্রেমিক জনগণের মঞ্চের ব্যানারে কাজ করেন, আপনারাও সে দাবি উত্থাপন করতে পারেন, জনমত গঠন করতে পারেন। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে ফেডারেল সুবিধা চাওয়া ‘আমড়া গাছে আম‘ চাওয়ার মতই নিষ্ফল আবেদন। বাংলাদেশ শুধু এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রই নয়, ক্রমশ তা একটি চরম কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলি হয় ‘হাইবারনেশন‘ ভোগ করছে, নয়ত অগস্ত্য যাত্রা করেছে। বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। ব্যর্থতার দায়ে কেউ কম দোষী নই। বৌদ্ধিক বন্ধ্যাত্ব চরম রূপ নিয়েছে। তাবেদারি মোসাহেবি সর্বত্র। অমানিশার অন্ধকারে চারিদিক ঢাকা পড়ছে। এমতবস্থায়, করণীয় স্থির করা দুরূহ, তবে অসম্ভব নয়। সঠিক নেতৃত্বে তা সম্ভব। আপাতত তেমন লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। তবে, অমাবষ্যার অবসান হয়, নতুন চাঁদ ওঠে আকাশে। আপনার আকাংখার সাথে আপনার বিষয় নির্বাচন ও সমালোচনা কেন জানি সামঞ্জস্যহীন মনে হল। পুনর্বিবেচনা কাক্ষিত। ভাল থাকুন।
ধন্যবাদান্তে, আমিরুল আলম খান, শিক্ষাবিদ ও সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*