কামাল আহমেদ-এর ঈশ্বরদীর উন্নয়ন ভাবনা
ঈশ্বরদীর প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও কল্যাণচেষ্টা

কামাল আহমেদ// গত ১ অক্টোবর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিশ্বের অন্তত ৪৬টি দেশে প্রবীণেরা সামাজিক সুরক্ষা পান না।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড় আয়ু বাড়ার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এদেশে প্রবীণদের সংখ্যা বেড়েছে ও বাড়ছে।

আজ যারা প্রবীণ তারাই জন্ম দিয়েছেন নবীনদের। তাদের প্রতিপালন করে বড় করেছেন, সাধ্যমতো প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিল তিল করে নিজেদের জীবনকে ক্ষয় করে। প্রবীণরাই গড়ে তুলেছেন বর্তমান সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা। অথচ দু:খজনক হলেও সত্য, প্রবীণরা ক্রমবর্ধমান হারে বঞ্চনা, নির্যাতন, অবহেলা ও নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণদের স্বার্থ সুরক্ষায় নানাবিধ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি এবং সুযোগসুবিধা আছে। দিন দিন তা বাড়ছেও। যেমন, এশিয়ার উন্নত অর্থনীতির দেশ জাপানে প্রবীণদের প্রায় সবাই ৬৫ বছরের পর থেকে আমৃত্যু পেনশনসুবিধা লাভ করেন। এছাড়া আবাসন, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাস-ট্রেনে যাতায়াতসহ অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে তাদের অগ্রাধিকার। টোকিও মহানগরীতে রয়েছে বহুসংখ্যক পার্ক। সেসব পার্ক উন্মুক্ত। তাছাড়া জনসমাগমের স্থানগুলোতে, বিশেষ করে পরিকল্পিত আবাসন এলাকা, ম্যানশন, শপিং কমপ্লেক্স, বড় বড় মার্কেট, প্রায় প্রতিটি রেলস্টেশনের সন্নিকটে পার্ক ও টয়লেটসুবিধাসহ রয়েছে বসার স্থান। সর্বোপরি, টোকিও মহানগরীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রতিটি নদীর দুই পাড়ই পরিকল্পিতভাবে বাধ দিয়ে সেখানে ফুলের বাগান, হাটাপথ এবং স্থানে স্থানে বসার জায়গা করা হয়েছে।

এসব স্থানে প্রবীণরা বন্ধুবান্ধবসহ বসে গালগল্প হাসিআনন্দে সময় কাটাতে পারেন এবং নদীর বাঁধানো পাড়ের হাটাপথে কোনরকম যান্ত্রিকযানের বিঘ্নবাধা ছাড়াই ইচ্ছামতো হাটাহাটি করতে পারেন।

কিন্তু আমাদের দেশে দিন দিন প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে চললেও তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা এবং জীবনের শেষ দিনগুলোকে আনন্দময় করার কোন ব্যবস্থাই এখনও পর্যন্ত নেই!

এদিক থেকে ঈশ্বরদীও ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৪ সালে ঈশ্বরদী পৌরসভা গঠিত হলেও, এখনো এখানে শহর এলাকার মধ্যে কোন পার্ক স্থাপিত হয়নি। প্রবীণদের নির্বিঘ্নে হাটাহাটি করার মতো কোন রাস্তা বা নির্দিষ্ট স্থানও নেই। নেই প্রবীণদের কোন বসার জায়গা বা উন্মুক্ত স্থান, যেখানে তারা বসে গল্পগুজব করে তাদের শেষ জীবনের অবসর সময়গুলো হাসি-আনন্দে পার করতে পারেন।

প্রবীণদের কোনরকম সুযোগসুবিধা না থাকার ওপরে আবার বোঝার ওপর শাঁকের আটির মতো বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতোই ঈশ্বরদীর প্রবীণরাও নবীন প্রজন্মের কাছ থেকে নানাভাবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অথচ, আজকের নবীনরাই আগামি দিনে অবধারিতভাবে পরিণত হবেন প্রবীণে!

ঈশ্বরদীর সামাজিক চেতনার মানও যথেষ্ট প্রসার লাভ করেনি। ফলে, এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, সংস্কৃতিসহ আর্থসামাজিক নানা ক্ষেত্রে এখানকার প্রবীণদের অতীত অবদান স্বীকার ও যথাযোগ্য মর্যাদা বা সম্মাননা প্রদানের বিষয়গুলো সবসময়ই উপেক্ষিত হয়ে আসছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে, সম্প্রতি এক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে হলেও একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঈশ্বরদী শাখা। সম্ভবত, গত এপ্রিলে তারা ঈশ্বরদীর প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিক কমরেড জসীমউদ্দিন মন্ডল ও শিক্ষানুরাগী সমাজসেবক মাহমুদুর রহমানকে সংবর্ধিত করেছে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, যা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

ঈশ্বরদীর প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে মনোরম পার্ক সৃজন, তাদের বসার জায়গা, হাটাপথসহ চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের অতীত অবদানের স্বীকৃতিসহ যথাযোগ্য সম্মাননা প্রদানের বিষয়গুলো নিয়ে এখানকার পৌর কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি সুশীল সমাজ কেউ কি কিছু ভাববেন না বা করবেন না?

লেখক: কামাল আহমেদ
মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, গীতিকার এবং সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*