কামাল আহমেদ-এর ঈশ্বরদীর উন্নয়ন ভাবনা
ঈশ্বরদীর মাদক ব্যবসা বন্ধ ও মাদকাসক্তি নিরসন ভাবনা

কামাল আহমেদ// স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে ঈশ্বরদীতে মাদক ব্যবসার প্রসার এবং স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার লক্ষ করা যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বস্তুত, বর্তমানে ঈশ্বরদীতে মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তি এমন এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যা এখানকার চিরচেনা সমাজ ও পারিবারিক জীবনকে শুধু তছনছই করে দিচ্ছে না, চরম বিপর্যয়কর অবস্থাও সৃষ্টি করে চলেছে। এমন অনেক পরিবার আছে, যে পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তানটি মাদকাসক্ত হওয়ায় শেষ জীবনে এসে বাবামাকে তিল তিল যন্ত্রণায় মানসিক কষ্ট ও অব্যক্ত যাতনা নিয়ে নিজ সন্তানের মতোই ধুকে ধুকে নিত্য মরণ মরতে হচ্ছে!

ঈশ্বরদীতে মাদক ব্যবসার প্রসারের মূল কারণ, মাদক চোরাচালানের সহজ ও বিস্তৃত খোলা রুট। বস্তুত, আড়মবাড়িয়া হতে শুরু করে পাকশী পর্যন্ত পদ্মা তীরবর্তী স্থান (এর মধ্যে বিশেষ করে মাজদিয়া- সাঁড়াঘাট এলাকা প্রধান) হচ্ছে মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট। আর বিক্রি? পদ্মা তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানসহ ঈশ্বরদী শহরের বহু স্থানে রয়েছে মাদক বিক্রির কেন্দ্র, যা পুলিশ প্রশাসনসহ সকলের কাছেই ওপেন সিক্রেট।
তবে, সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনাকালে ঈশ্বরদীর এক দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ঈশ্বরদীতে পারিবারিকভাবে মাদক ব্যবসা করা হয়। রেলের কোয়ার্টারগুলো মাদক ব্যবসার প্রধান ঘাটি। পুলিশ অভিযান চালায়। ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে। আবার তারা জামিন নিয়ে এসে ব্যবসা শুরু করে।

পুলিশ কর্মকর্তার কথায় সত্যতা যেমন আছে তেমনি তার কথাতেই স্পষ্ট যে ঈশ্বরদীর মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক ব্যবসার ঘাটিগুলো কোথায় কীভাবে সক্রিয় রয়েছে, সেসব তথ্যও পুলিশ প্রশাসনের ভালোই জানা আছে। আর এ সত্যও অস্বীকার করা যায় না যে, প্রত্যক্ষ- পরোক্ষভাবে থানাপুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা ছাড়া মাদক চোরাচালান ও ব্যবসা টিকে থাকতে পারেনা।

যে পুলিশি অভিযানের কথা বলা হচ্ছে, প্রশ্ন হলো, মাদকব্যবসা প্রতিরোধে তা যথেষ্ট কি না? এর উত্তরে এক কথায় অনেকেই বলেন, না।

মাঝেমাঝে লোকদেখানো গোছের পুলিশি অভিযান পরিচালিত হলেও, এই ভয়াবহ ব্যবসার গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। ফলে, এর বিস্তার রোধ করা যায় না। মাদকব্যবসার বিস্তার আর এর খুটি যে অনেক গভীরে প্রোথিত, তা এর উত্তরোত্তর অব্যাহত বিস্তৃতির মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়।

তবে, এ সত্যও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শুধুমাত্র পুলিশের আন্তরিক বা উদ্দেশ্যমূলক অভিযানের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরদীর ভয়াবহ মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তির বিস্তার রোধ বা বন্ধ করা যাবে না। আর এক্ষেত্রে সচেতন ঈশ্বরদীবাসীর সামাজির দায়দায়িত্বও অস্বীকার করা যাবে না।

সুতরাং, মাদকব্যবসা বন্ধ ও মাদকাসক্তি নিরসনের জন্য পুলিশি পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন হচ্ছে, প্রবল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো।

মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন শুরু করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সব স্তরের প্রতিনিধিত্বশীল নেতাকর্মীদের। আর সেই আন্দোলনের সাথে আবশ্যিকভাবে যুক্ত করতে হবে পুলিশ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনী, সংস্থা এবং সিভিল প্রশাসনকেও।
অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক এই আন্দোলন যত তাড়াতাড়ি শুরু হয়, ততই ঈশ্বরদীবাসীর মঙ্গল।

কিন্তু কথা হচ্ছে, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

লেখক: কামাল আহমেদ
মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, গীতিকার এবং সাংবাদিক
০৩.১০.২০১৫

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*