আওয়ামী লীগের কোন্দলে সুযোগ খুঁজছে বিএনপি

সেলিম সরদার// পাবনা-৪ আসনে (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) এমপি পদের দলীয় মনোনয়ন ঘিরে দুই নেতার দ্বন্দ্বে দীর্ঘদিন ধরেই কোন্দলে ভুগছে বিএনপি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসনের এমপি নির্বাচিত হন ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। এর পরের তিনটি নির্বাচনেও নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। চলতি মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হয়ে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছেন।

বর্তমানে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে থাকা এই মন্ত্রী আগামী নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থিতা করতে চান। তবে ভোটের লড়াইয়ে নামার আগে প্রবীণ এই রাজনীতিককে এবার নিজ দলেই পড়তে হয়েছে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে। প্রতিদ্বন্দ্বী তালিকায় রয়েছেন তার নিজের মেয়ে এবং মেয়ের জামাইওঙ্ঘ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, নিজের অবস্থান সুসংহত রাখতে ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়ার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন ভূমিমন্ত্রী ডিলু। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের বিভিম্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন তার পরিবারের ১৩ জন। তাদের মধ্যে শামসুর রহমান শরীফের ভাই, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে জামাতাও রয়েছেন। তাদের দাপটে ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত ও কোণঠাসা।

এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণে ‘নৌকার ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এই আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বিপর্যয়ের মুখে আছে বলেও দাবি করেন অনেকে। সাম্প্রতিককালে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে তার মেয়ের জামাই আবুল কালাম আজাদ মিন্টুর প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দিয়েছে। মিন্টু ঈশ্বরদী পৌরসভা মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। জামাই-শ্বশুরের দ্বন্দ্বের কারণে আগামী নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে কোন্দল ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে।

এমন পরিস্থিতিতে শ্বশুরকে টেক্কা দিতে আগামী নির্বাচনে এমপি পদে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে পৌর মেয়র মিন্টু মাঠে থাকবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম লিটন, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মন্ত্রীর মেয়ে ও মেয়র মিন্টুর স্ত্রী মাহজেবিন শিরিন পিয়া এবং তরুণ শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক নেতা প্রকৌশলী আবদুল আলিম। এ ছাড়াও আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে তৎপরতা চালাচ্ছেন আটঘরিয়ার সাবেক এমপি পাঞ্জাব বিশ্বাস, আটঘরিয়ার পৌর মেয়র এবং আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম রতন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতা অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম বুদু, ব্যারিস্টার সৈয়দ আলী জিরু প্রমুখ।

নিজ দলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকার পরও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শামসুর রহমান শরীফ ডিলু শতভাগ আশাবাদী। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নিজেকে দলের দুর্দিনের কান্ডারি বলে অভিহিত করে বলেন, দলের জন্য কাজ করেছেন। স্থানীয় ভোটারদের পাশে থেকেছেন। চারবার এমপি হয়েছেন। তার মেয়াদকালে ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়াসহ পুরো পাবনা জেলায় ব্যাপক উম্নয়ন হয়েছে। তাই শেষ বয়সে অবশ্যই দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলে মনে করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের অন্য প্রার্থীদের মধ্যে তরুণ শিল্পপতি আবদুল আলিম নিজেকে ক্লিন ইমেজের মানুষ বলে দাবি করেন। দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের কল্যাণে কাজ করেছেন বলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের রফিকুল ইসলাম লিটন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে তিনি রাজনীতি করছেন। প্রতিপক্ষের হাতে নিগৃহীত হয়েও বিপদে-আপদে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। তাই মূল্যায়ন পাওয়ার আশা তার।

মন্ত্রীর মেয়ে ও মেয়রের স্ত্রী মাহজেবিন শিরিন পিয়া বলেন, ‘আমার বাবা, মা, স্বামী, ভাই- সবাই রাজনীতি করেন। বাবা আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইবেন, যদি না পান, তাহলে আমি চাইব।’ নিজেকে শক্তিশালী একজন প্রার্থী বলেও দাবি করেন পিয়া।
পৌর মেয়র মিন্টু বলেন, ‘তৃণমূলের একজন কর্মী হিসেবে মনোনয়ন চাইতেই পারি। পৌর নির্বাচনে নৌকা জিতেছে, সংসদ নির্বাচনেও জিতবে। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই কাজ করব। যদি আমাকে দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নৌকার পক্ষেই কাজ করা উচিত।’

রেজাউল রহিম লাল বলেন, ‘এই আসনে রাজতন্ত্র চলছে। স্থানীয়দের জন্য কাজ করতে চাই বলে এমপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাই।’

দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের এই রেষারেষির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী নির্বাচনে ‘ভিআইপি আসন’ হিসেবে পরিচিত এই আসনটি দখলে নেওয়ার তৎপরতা চলছে বিএনপিতে। এই আসনে বিএনপির রাজনীতিতে বিভক্তির কারণ- দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দলটির সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলাম সরদার এবং কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমান হাবিবের দ্বন্দ্ব। ১৯৯১ সালে হাবিবুর রহমান হাবিব আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে সিরাজুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। তখন দলীয় বিবাদের জের ধরে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিব বিএনপিতে যোগ দেন। একই দলে যোগ দিয়েও সিরাজুল ও হাবিব রাজনীতির মাঠে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে পড়েছেন। সিরাজ সরদার দলীয় মনোনয়ন পেলে হাবিব তার বিপক্ষে অবস্থান নেন। আবার হাবিব মনোনয়ন পেলে সিরাজ সরদার দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এতে চার বার বিএনপি ওই আসনে পরাজিত হয়। এ ছাড়া এই আসনে জামায়াতের রয়েছে বিপুল ভোট। ১৯৯১ সালে জামায়াতের তৎকালীন আমির মরহুম মাওলানা নাসির উদ্দিন ৪০ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এই আসনে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী হতে কাজ করছেন। তাই আসন ভাগাভাগি না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের ঠান্ডা লড়াই থেকেই যাবে।

এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলাম সরদার বলেন, ‘আমার জীবনটাই বিএনপি। তাই দল অবশ্যই সব বিবেচনা করে আমাকেই মনোনয়ন দেবে।’ বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, তিনি ত্যাগ স্বীকার করলেও দল তাকে এখনও সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। এবার মনোনয়ন দিয়ে মূল্যায়ন দেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা এই সাবেক ছাত্রনেতার।

এ ছাড়া শিল্পপতি আকরাম আলী খান (সঞ্জু খাঁ) এবং ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মোকলেছুর রহমান বাবলু এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সল্ফপাদক জাকারিয়া পিন্টুও প্রার্থী হতে আগ্রহী বলে শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস জানান, মহাজোটের হয়ে তার দল নির্বাচন করলে তিনি মহাজোটের মনোনয়ন চাইবেন। তবে দল জোটগত নির্বাচন না করলে তিনি একক নির্বাচনে অংশ নেবেন না।

জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল বলেন, পাবনা জেলার তিনটি আসন জামায়াতের। এগুলো হলো পাবনা-১ বেড়া সাঁথিয়া, পাবনা-৫ সদর এবং পাবনা-৪ ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া। তাই এই তিন আসন ছেড়ে দেওয়া হবে না। আসন ভাগাভাগি না হওয়া পর্যন্ত আমরা দলের হয়ে কাজ করব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*