ঈশ্বরদী আওয়ামী লীগের প্রাণ পুরুষ আব্দুর রহিম মালিথা

রফিকুল ইসলাম লিটন// ১৯৮৬ সালের কোন এক সময়ের কথা। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ মাঠে আমরা ফুটবল খেলছিলাম। সে সময় জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা মাঠ থেকে ডেকে নিয়ে কবির ভাই, কল্লোল আর আমাকে শুধু ছাত্রলীগ করার কারণে অন্যায়ভাবে মেরেছিল। সেদিনই সন্ধ্যার পর কলেজ রোডে কল্লোলদের বাড়ির সামনে জাতীয় পার্টির মিছিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিবাদ করলাম। ওখানে ব্যাপক মারামারি হলো। অনেকের নামেই মামলা হলো। দুই তিন দিন পরে বকুলের মোড়ের সেন্টু ভাইয়ের বাসা থেকে রাতে আমাকে আর সেন্টু ভাইকে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে গেল। ফজরের নামাজের পরপরই দেখি রহিম ভাই, তুতুল ভাই, ঘেপু ভাই আর সুজাবত স্যার থানায় এসেছেন। তখন থানার ওসি ছিলেন হাবিবুর রহমান। রহিম ভাই থানায় ঢুকেই ওসি সাহেবকে ডেকে এনে বললেন, কয়েকদিন পরেই লিটনের এসএসসি পরীক্ষা ওদের ছেড়ে না দিলে আমি থানা থেকে যাবো না। আমাকেও গ্রেফতার করতে হবে। রহিম ভাইয়ের অনড় সিদ্ধান্তের কারণে ওসি সাহেব সেদিন আমাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন ছাড়া না পেলে হয়তো আমার আর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হতো না। জীবনটাই অন্য রকম হয়ে যেতো।

১৯৮৮ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু হত্যার আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক রশিদের ঈশ্বরদী বাস স্ট্যান্ডে জনসভা করার কথা ছিল। এখনো মনে আছে জসিম ভাইয়ের কারখানায় আমাদের ডেকে নিয়ে রহিম ভাই বলেছিলেন ঈশ্বরদী থেকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে জীবন দিতে হবে। আমরা রাজি হলাম। রহিম ভাই বললেন আমিও তোমাদের সঙ্গে থাকবো। প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে পরের দিন খুনিদের জনসভা আর ঈশ্বরদীতে হয়নি। আমাদের প্রিয় জন্মভূমির মাটিও সেদিন কলঙ্কের হাত থেকে বেঁচে গেছে।

সাইকেল মার্কা নিয়ে রহিম ভাই পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমার আর ফরিদের উপর মাইকিং এর দায়িত্ব পড়লো। আমরা শহরের প্রতিটি রা¯Íায় ঘুরে ঘুরে প্রতিদিন মাইকিং করতাম। নির্বাচনের দুই তিন দিন আগে রহিম ভাই ডেকে নিয়ে বললেন তোমরা এতো কষ্ট করছো কিন্তু আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আমার জয় লাভের সম্ভাবনা কম। পরাজিত হলে তোমরা কষ্ট পেয়ো না। আমি বললাম পরাজিতই যদি হই নির্বাচন করে লাভ কি। তখন ভাই বললেন নির্বাচনে আমি জয়ী হতে না পারলেও সংগঠনতো শক্তিশালী হবে।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঈশ্বরদীর আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতায় নৌকা মার্কায় আমরা পরাজিত হলাম। ঈশ্বরদীতে নেমে এলো বিএনপির নির্যাতনের কালো ছায়া। নেতা-কর্মীদের বাজারের ব্যাগ পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হতো। ১৯৯৪ সালে হত্যার উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার ট্রেনে বৃষ্টির মতো গুলি করলো বিএনপির গুন্ডা বাহিনী। আমার বাসায় একইদিনে দুইবার হামলা করলেছিল। আমি আর সেন্টু ভাইসহ কয়েকজন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলাম। আমাকে না পেয়ে আমার মাকে নির্যাতন করা হলো। তখনও রহিম ভাইয়ের নারিচার বাড়ি ছিল আমাদের আশ্রয়স্থল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের থাকা খাওয়া এমনকি নগদ টাকাও দিতেন রহিম ভাই। অভয় দিতেন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সাহস যোগাতেন।

মেধা,আত্মত্যাগ, সাহস আর অসীম ধৈর্য্য দিয়ে রহিম ভাইয়েরা তিলে তিলে আওয়ামী লীগের ভীত মজবুত করেছিলেন। ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সংগঠনে রূপ দিয়েছিলেন।

রহিম ভাই আজ নেই, তাঁর রেখে যাওয়া সংগঠন আজ বিধ্বস্ত। নিজেদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, হামলা-মামলায় নেতা-কর্মীরা আজ জর্জরিত। সবাই আজ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সংগঠন ধ্বংস করার প্রতিযোগিতা চলছে।

ঈশ্বরদীর আওয়ামী লীগের আজকের এই ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে বার বার মনে পড়ে আজ একজন রহিম ভাইকে খুব দরকার। ২২ সেপ্টেম্বর ছিল আমাদের প্রিয় রহিম ভাইয়ের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। দোয়া করি তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তিতে থাকুক। তাঁর সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হোক নতুন প্রজন্ম। শক্তিশালী হোক তাঁর রেখে যাওয়া স্বপ্নের ঠিকানা আমাদের প্রাণের সংগঠন ঈশ্বরদীর আওয়ামী লীগ।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*