শত বছরের কালের সাক্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রেলসেতু

0
328

ঈশ্বরদী উপজেলার পাক্শীতে অবস্থিত এশিয়ার বৃহত্তম রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রেল যোগোযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এপারে ঈশ্বরদী সাঁড়াঘাট এবং ওপারে ভেড়ামারার দামুকদিয়া-রাইটা ঘাটের মাঝে সেতুবন্ধনের সৃষ্টি করেছে এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। আর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে প্রমত্তা পদ্মা নদী।

এক সময় অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গের সাথে কলিকাতার যোগাযোগ বাহন ছিল কেবল মাত্র জাহাজের মাধ্যমে। জাহাজগুলো নারায়নগঞ্জ বন্দর থেকে ছেড়ে সাঁড়া, দামুকদিয়া ও রাইটা ঘাট হয়ে কলিকাতা বন্দরে গিয়ে পৌছাতো। এ অঞ্চলের শাক-সবজি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার কাঁচামাল কলিকাতা যেতো। এভাবেই এ অঞ্চলের সাথে কলিকাতার আত্বিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পূর্বলগ্ন পর্যন্ত এ অবস্থা বলবৎ ছিল।

একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য অপরদিকে পর্যটক তথা অবিভক্ত ভারতের পূর্বঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তর পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কলিকাতা দিল্লীর সহজ যোগাযোগের কথা বিবেচনা করে বৃটিশ শাসিত ভারত সরকার ১৮৮৯ সালে পদ্মা নদীর উপর দিয়ে সেতু তৈরির প্রস্তাব পেশ করে। ১৯০৮ সালে সেতু নির্মাণের মঞ্জুরি লাভের পর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে বৃটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইলস হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯০৯ সালে পদ্মায় সেতু নির্মাণের জন্য সার্ভে করা হয়। ১৯১০-১১ সালে প্রথম কাজের মৌসুম শুরু হলে ভয়াল পদ্মার দুই তীরে সেতু রক্ষী বাঁধ নির্মণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে মূল সেতুর কাজ শুরু হয় পরের বছর।

সেতুটির প্রস্তাবের উপর প্রথম প্রকল্প প্রণয়ন করেন স্যার এস, এম রেনডলস। শুধু সেতু নকশা প্রণয়ন করেন প্রধান প্রকৌশলী স্যার রর্বাট উইলিয়াম গেইলস। প্রথমে সেতুটির কাজ শুরু হয় বর্তমান স্থান থেকে ১ কিঃ মিঃ দক্ষিণে। প্রাথমিক কিছু কাজ হওয়ার পর স্থান পরিবর্তন করে বর্তমান স্থানে নিয়ে আসা হয়। সেতুতে রয়েছে মূল পনেরটি স্প্যান, যার প্রতিটি বিয়ারিংদ্বয়ের মধ্যবর্তী দৈর্ঘ্য ৩’শ ৪৫ ফুট এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১ হাজার ২’শ ৫০ টন, রেললাইন সহ ওজন ১ হাজার ৩’শ টন। সেতুটিতে পনেরটি স্প্যান ছাড়াও দু’পাশে রয়েছে ৩ টি করে অতিরিক্ত ল্যান্ড স্প্যান। এ ছাড়াও দুটি বিয়ারিং এর মধ্যবর্তী দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট। সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮’শ ৯৪ ফুট অর্থাৎ ১ মাইলের কিছু বেশি।

সেতুটি নির্মাণের ঠিকাদার ছিলেন ব্রেইথ ওয়ালটি এন্ড ক্রিক। সেতু নির্মাণের চেয়েও নদীর গতি নিয়ন্ত্রণ করা কম কষ্টসাধ্য ছিল না। প্রকৃত পক্ষে বড় সমস্যা ছিল প্রমত্তা পদ্মার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে স্থায়ীভাবে প্রস্তাবিত সেতুর নিচ দিয়ে যাওয়া। সেতু নির্মাণের ১’শ বছর পর আজও এ সেতু নির্মাণের কাজ বা রিভার ট্রেনিং ওয়ার্ক পৃথিবীর প্রকৌশলীদের নতুন ধরনের অনুপ্রেরণা যোগায়। ১৯১২ সালে সেতুর গাইড ব্যাংক নির্মাণ শুরু হয়। এই গাইড ব্যাংক ৪/৫ মাইল উজান থেকে বেঁধে আসা হয়। সে বছরই সেতুর গার্ডার নির্মাণের জন্য পাঁচটি কুপ খনন করা হয় এবং পরের বছর সাতটি কুপ খনন শুরু হয়। তারপর লোহা ও সিমেন্টের কংক্রিটের বিশাল বিশাল পায়াগুলো নির্মত হয়। এই সেতু নির্মাণ করতে পদ্মার উপর স্টিমার বার্জ নিয়ে আসা হয়।

সে সময় দিন-রাত কাজ করার পর ব্রিজ নির্মাণ ও সেতু রক্ষা বাঁধের জন্য মাটির প্রয়োজন হয় ১.৬ কোটি ঘনফুট এবং নদী নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হয় ৩ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট মাটির। মোট পাথর প্রয়োজন হয় ৩ কোটি ৮ লাখ ঘনফুট। মোট ইটের গাঁথুনির কাজ হয় ২ লাখ ৯৯ হাজার টন। মোট ইস্পাত ব্যবহৃত হয় ৩০ লাখ টন। মোট সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় ১ লাখ ৭০ হাজার ড্রাম ফিল্ড সিমেন্ট। তৎকালীন হিসেবে সেতু তৈরির ব্যয় হয় মূল স্পানের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৪ হাজার ৭’শ ৯৬ টাকা। এটি স্থাপনের জন্য ৫ লাখ ১০ হাজার ৮’শ ৪৯ টাকা, নদী নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯৪ লাখ ৮ হাজার ৩’শ ৪৬ টাকা। দুই পাশের রেল লাইনের জন্য ৭১ লাখ ৫৫ হাজার ১’শ ৭৩ টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ৩ কোটি ৫১ লাখ ২৯ হাজার ১’শ ৬৪ টাকা ব্যয় হয়।

হার্ডিঞ্জ সেতুর বিশেষত্ব হচ্ছে এর ভিত্তির গভিরতা। বাংলাদেশের নরম পলি মাটিতে বড় স্প্যানের সেতু গড়তে ভিত্তির গভিরতা চাই প্রচুর। ভিত্তির জন্য দুটো কুয়ো বসানো হয়। একটি পানির সর্ব নিম্ন সীমা থেকে ১’শ ৬০ ফুট নিচে এবং অপরটি বসানো হয় ১’শ ৫০ ফুট নিচে। ১৫ নম্বর সেতু স্তরের কুয়ো স্থাপিত হয়েছে পানির নিম্ন সীমা থেকে ১’শ ৫০ দশমিক ৬০ ফুট নিচে এবং সর্বোচ্চ সীমা থেকে ১’শ ৯০ দশমিক ৬০ ফুট অর্থাৎ সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১’শ ৪০ ফুট নিচে। সেতু তৈরিকালীন সারা পৃথিবীতে এ ধরনের ভিত্তির জন্য এটিই ছিল গভিরতম।

১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকল্পটিতে কর্মী সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৪’শ। এই ২৪ হাজার ৪’শ শ্রমিকের দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৯১৫ সালে সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ওই সময়ে ইংরেজি নবর্ষের দিনে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ১৯১৫ সালে ১ ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম চালু হয় মাল গাড়ি। দুই মাস পরেই ৪ মার্চ ১৯১৫ সালে সেতুর উপর ডবল রেল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচলের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভাইসরয় লড হার্ডিঞ্জ যার নামে বর্তমানে সেতুটির নাম করণ হয়েছিল হর্ডিঞ্জ সেতু।

আজ থেকে ১২৭ বছর আগে ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারত উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে। বিশেষ করে ভারতের দার্জিলিং ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে যাতায়াতের সুবিধার্থে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ও পাবনা জেলার সীমারেখায় পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করে।

সেতু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ও নামফলকে ১৯১২ সালে স্থাপিত দেখে জানা যায়, ২০১২ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১০০ বছর পার করল। ওই সময় পদ্মা নদীর পূর্বতীর বর্তমান কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা গোলাপনগর সাঁড়াঘাট। অপর দিকে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়াঘাট ছিল দেশের অন্যতম বৃহত্ নদীবন্দর। যেখানে দেশি-বিদেশি বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ, বার্জ, মহাজনী নৌকা ইত্যাদি ভিড়ত সাঁড়াবন্দরের ১৬টি ঘাটে। এ অবস্থায় খরস্রোতা পদ্মাগর্ভে বহু লঞ্চ, স্টিমার ডুবে প্রাণহানি ও মালামালের ক্ষতি হয়। বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দার্জিলিং ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে দেশি-বিদেশি পর্যটক যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে ভাতের কাঠিহার থেকে রেলপথ আমিনগাঁ আমনুরা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে অবিভক্ত ভারত সরকার তখন পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব পেশ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯ সালের ব্রিজ তৈরির সেই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত চার বছর ধরে ব্যাপক স্টাডি করে ম্যাচ এফ জে স্প্র্রিং একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। দীর্ঘ জরিপের পর সাঁড়াঘাটের দক্ষিণে ব্রিজ নির্মাণের সম্ভাব্যতার তথ্য সরকারের কাছে সরবরাহ করে এবং ১৯০৭ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। ১৯০৮ সালে ব্রিজ নির্মাণের মঞ্জুরি লাভের পর ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ হিসেবে, ব্রিজের মূল নকশা প্রণয়নের জন্য স্যার এস এম বেনডেলেগকে ও প্রকল্প প্রণয়নের জন্য স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং এবং ঠিকাদার হিসেবে ব্রেইথ ওয়াইট অ্যান্ড কার্ককে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় কূপ খনন, বসানো হয় ১৫টি স্প্যান যার প্রতিটি বিয়ারিং টু বিয়ারিং এর দৈর্ঘ্য ৩৪৫ ফুট দেড় ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৫২ ফুট। প্রতিটি স্প্যানের ওজন ১ হাজার ২৫০ টন। রেল লাইনসহ ১ হাজার ৩০০ টন, এছাড়াও দু’পাশে ল্যান্ড স্প্যান রয়েছে যার দূরত্ব ৭৫ ফুট। ব্রিজটির মোট দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮৯৪ ফুট (১ মাইলের কিছু বেশি)। ব্রিজ নির্মাণে মোট ইটের গাঁথুনি ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ইস্পাত ৩০ লাখ টন, সাধারণ সিমেন্ট ১ লাখ ৭০ হাজার ড্রাম এবং কিলডসিমেন্ট (বিশেষ আঠাযুক্ত) লাগানো হয় ১২ লাখ ড্রাম। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১ হাজার গজ ভাটি থেকে ৬ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ১৬ কোটি ঘন ফুট মাটি ও ২ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ঘনফুট পাথর ব্যবহার করে গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৩ কিলোমিটার প্রস্থ নদীর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা-পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ স্থলে দু’পাশে বাঁধ দিয়ে ১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার নদী সংকুচিত করা হয় এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের সময় ব্রিজটির অ্যালাইনমেন্টে নদীর পানির বহন ক্ষমতা দাঁড়ায় ২৫ লাখ ঘনফুট।

১৯১২ সালের আগে শ্রমিক সংখ্যা কম থাকলেও ১ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ থেকে প্রকল্পটিতে কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় তখন থেকে ২৪ হাজার ৪ শত শ্রমিক যারা দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৪ সালের শেষের দিকে ব্রিজটির কাজ শেষ করে। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ডাউন লাইন দিয়ে প্রথমে মালগাড়ি (ট্রেন) চালানো হয়। ২ মাস পর ৪ মার্চ ডবল লাইন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। সেই সময় ব্রিজটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন, তত্কালীন ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসার ব্রিজটির নামকরণ হয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ টাকা। এর মধ্যে স্প্যানের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ৬ হাজার ৭৯৬ টাকা, ল্যান্ড স্প্যানের জন্য ৫ লাখ ১৯ হাজার ৮৪৯ টাকা, নদীর গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ৯৪ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ টাকা ও দুই পাশের রেল লাইনের জন্য ৭১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৩ টাকা। টাকার মান হিসাব করতে গেলে গ্রামের কয়েকজন দর্শনার্থীর উক্তি শুনে বোঝা যায় ‘ব্রিজটির বড় বড় লোহার গার্ডার দেখে মন্তব্য করেন পাঁচশ’ টাকার নোহাই লেগেছে!’ প্রবাদ আছে ১ টাকায় ১৬ মণ চাল পাওয়া যেত সে সময়।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকারের নির্মিত ব্রিজটির খ্যাতি বিশাল পরিচয় বহন করে। বর্তমান জগতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের চেয়েও লম্বা ব্রিজ ও সেতু অনেক আছে। কিন্তু কিছু কিছু কারণে এ ব্রিজটি অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে বিখ্যাত। প্রথম কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের ভিত গভীরতম পানির সর্বনিম্ন সীমা থেকে ১৬০ ফুট বা ১৯২ এমএসএল মার্টির নিচে। এর মধ্যে ১৫ নম্বর স্তম্ভের কুয়া স্থাপিত হয়েছে পানি নিম্নসীমা থেকে ১৫৯ দশমিক ৬০ ফুট নিচে এবং সর্বোচ্চ সীমা থেকে ১৯০ দশমিক ৬০ ফুট অর্থাত্ সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১৪০ ফুট নিচে। সে সময় পৃথিবীতে এ ধরনের ভিত্তির মধ্যে এটাই ছিল গভীরতম। বাদবাকি ১৪টি কুয়া বসানো হয়েছে ১৫০ ফুট মাটির নিচে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এ ব্রিজের জন্য রিভার ট্রেনিং ব্যবস্থা আছে তাও পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। ব্রিজটি অপূর্ব সুন্দর ও আর্কষণীয় হওয়াতে ব্রিটিশ ইন চিফ ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধে  ক্ষতিগ্রস্ত এবং সংস্করণ
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী পশ্চাদাপসরণের মুখে ব্রীজের স্প্যানের ১২ নং স্প্যানটিতে বোমার আঘাতে ধ্বংস করে। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ১৫ নং স্প্যানটির ক্রসগাডার ও দুটো স্ট্রিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া দুই নং সেতু স্তরের উপরের স্পাতের ট্রাসেলটিও সেলের আঘাতে বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রহস্ত হয়।

দেশ স্বাধীনতার পর শুরু হয় ১২ নং স্প্যানের উদ্ধার কাজ ও সেতু মেরামত। ব্রিটিশ সরকার অতিদ্রুততার সঙ্গে তাদের নিজ খরচে বিশ্ব সংস্থার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত জাহাজ উদ্ধারকারী কোম্পানি সেলকোকে দিয়ে উদ্ধার কাজ করেন। উল্লেখ্য হাডিঞ্জ ব্রিজ পূণঃনির্মাণের কাজে যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে ভারতের পূর্ব রেলওয়ে মন্ত্রী এইচ কে ব্যানার্জী, চিপ ইঞ্জিনিয়ার আর কে এম কে সিংহ রায়, ডভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইন শ্রী পিসিজি মাঝি উল্লেখ্য যোগ্য। যুদ্ধ বিধ্বস্ত তৎকালীন বাংলাদেশে রেলওয়েকে যারা নবজীবন দান করেন তারা হচ্ছেন তৎকালীন বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান আঃ মুহিত চৌধুরী, মেম্বরর এম এ গফুর ইঞ্জিনিয়ার, মেম্বর সৈয়দ মর্তুজা হোসেন প্রমুখ। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পূণঃনির্মানের কাজে বাংলাদেশ রেলওয়ের আরও যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে চিফ ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ আলী, এম রহমান, ডিভিশনাল সুপারেনটেনডেন্ট সৈয়দ হোসেন এবং ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার এম মুনাফ।

বহু ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফলে আবার প্রমত্তা পদ্মার উপর দিয়ে রেলপারাপার শুরু হয় ১২ ই অক্টোবর ১৯৭২ সালে। বর্তমানে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অন্যতম। প্রতিদিন সকাল থেকে দূরদূরান্তের বহু মানুষ এবং বিদেশী পর্যটক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে আসেন। শীত মৌসুমে এখানে পিকনিক করতে আসেন অনেকে। বর্ষার সময় প্রমত্তা পদ্মা নদীর ভয়াল রুপ মানুষের হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার করে। জেলেদের জালে ধরা পড়ে মাছের রাজা রুপালী ইলিশ। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনাথী হার্ডিঞ্জ ব্রীজের নিচে এসে এ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী ব্রিজটির ওপর একাধিক বোমা বর্ষণ করে। এর ফলে পিলারের ওপর থেকে ১২নং স্প্যান (গার্ডার)টির এক প্রান্ত নদীর মাঝে পড়ে যায়। ৯নং স্প্যানটির নিচের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (যদিও পাকহানাদার বাহিনী না ভারতীয় বাহিনী ব্রিজটিতে বোমা বর্ষণ করে তা নিয়ে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। পাক বাহিনীকে দক্ষিণ বঙ্গে প্রবেশ না করতে দেয়ার কৌশলগত কারণে পিলারের উপরে এবং গার্ডারের নিচে ডিনামাইন্ড বসিয়ে ওপর থেকে বোমা মেরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আর যে বোমা দ্বারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ক্ষতিসাধন করা হয় তা এখনও পাকশীর বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের কার্যালয়ের সামনে সংরক্ষিত রয়েছে।

পরে ব্রিজটি মেরামত করে ভারতের পূর্ব রেলওয়ে শ্রী এইচকে ব্যানার্জি, চিফ ইঞ্জিনিয়ার শ্রী আরকে এসকে সিংহ রায়, ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, শ্রী পিসিজি মাঝি, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। এছাড়া বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে ছিলেন রেলওয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ মো. ইমাম উদ্দিন আহমেদ, ডিভিশনাল সুপার এম রহমান প্রমুখ। মেরামত হওয়া গার্ডারটি বর্তমানে কিছুটা দেবে গেছে, ফলে ট্রেন ইঞ্জিনের চালকরা গাড়ির গতি কমিয়ে ব্রিজ পারাপার হয়।

ব্রিজটি ১৯১২ সালে স্থাপন অনুযায়ী বর্তমান ২০১২ সালে ১০০ বছর পূর্ণ করল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার ১০০ বছরের গ্যারান্টি দিয়েছিল যে, এ সময়ের মধ্যে ব্রিজটির কোনো প্রকার পরিবর্তন ঘটবে না সত্যিই তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বর্তমানে ১০০ বছর পার হলো ব্রিজটির বয়স। এখন কে দেবে এর ওয়ারেন্টি/গ্যারান্টি সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহলকে ভেবে দেখা দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*