‘সাম্প্রতিক যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে ঈশ্বরদীর ৭০ মুক্তিযোদ্ধা বাদ পরার আশঙ্কা’

0

মতিউর রহমান// ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঈশ্বরদী থানা এলাকায় যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা সাম্প্রতিক যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের আওতায় বাদ যেতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তৎকালীন মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডার ও সাবেক ঈশ্বরদী উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুজ্জামান বিশ্বাস। রোববার রাতে এক ফোনালাপে তিনি এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন।

নুরূজ্জামান বিশ্বাস আক্ষেপ করে বলেছেন, আমার বয়স প্রায় ৭০ বছর হতে চললো, মুক্তিযুদ্ধেরও ৪৬ বছর গত হয়েছে কিন্তু কেউ কোনদিন কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। এখন নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের নামে গোটা মুক্তিযুদ্ধকেই কলঙ্কিত করার একটা হীন চক্রান্ত চলছে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে যাচাই-বাছাই কমিটির কেউ কেউ মুজিব বাহিনীর নামই শোনেননি। আবার কেউবা শুনলেও অজ্ঞাত কারণে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চাইছেন না। অথচ আমরা ভারতের দেরাদুন জেলার তান্দুয়া পাহাড়ী এলাকায় স্থাপিত ট্রেনিং ক্যাম্পে সবচেয়ে ব্যায়বহুল প্রশিক্ষণটাই পেয়েছেলাম। আমরা গেরিলা নই, আমাদেরকে পলিটিক্যাল কমাণ্ডো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। একাত্তরের আগষ্ট সেপ্টেম্বরের দিকে আমরা পর্যায়ক্রমে দেশে প্রবেশ করে পাকহানাদার বাহিনী ছাড়াও রাজাকার-নক্সালদের নির্মূলে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছি।

গেরিলাদের মত আমাদের বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়াতেও ভিন্নতা ছিল, আমি আঞ্চলিক কমান্ডার হলেও আমার অধীনে ৬টি গ্রুপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ গ্রুপগুলোর কমাণ্ডার ছিলেন চাঁদ আলী, মরহুম আমিনুল ইসলাম চুনু, মরহুম আমির হোসেন বাবলু, সাবেক সাংসদ মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস ও নজরুল ইসলাম মিন্টু। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকলীন অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি তারা ন’মাসে ৯টি গুলিও করেননি তাদের অস্ত্র থেকে। অথচ ঈশ্বরদী ও এর আশেপাশে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে প্রায় সবগুলো যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছি, কয়েকশ’ নক্সালকে নিরস্ত্র করেছি, রাজাকার-আলবদরকে খতম করেছি, মোটকথা একদিনও ঘুমিয়ে কাটাইনি। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে যাচাই-বাছাই কমিটিতে না রেখে বরং গোটা মুজিব বাহিনীকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। এসব করে কেউ পার পাবেনা বলেও সাবেক এই মুজিব বাহিনী প্রধান হুঁসিয়ারি উচ্চারণ করেন।

এদিকে তালিকা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার শুরুর দিন গতকাল রোববার কোনরূপ হট্টগোল ছাড়াই পার হয়েছে। অনলাইনে গ্রহণকৃত উন্মুক্ত দরখাস্ত মোতাবেক ঈশ্বরদীর অতিরিক্ত ৬ শ ৮৯ জন বাদপড়া মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে। গতকাল মুলাডুলি ও দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ৬৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়। চলতি মাস শেষাবধি এই কার্যক্রম চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যাচাই-বাছাই কমিটি ইতোমধ্যে পুনর্গঠনও করা হয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে। নতুন কমিটিতে পদাধিকারবলে রয়েছেন স্থানীয় সাংসদ ও মাননীয় মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিল মাহমুদ, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের থানা কমাণ্ডার আব্দুল খালেক, কমাণ্ডের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে গোলাম মোস্তফা (চান্না মণ্ডল), মোঃ রশীদুল্লাহ, আবুল বাসার ও আ.ত.ম. শহীদুজ্জামান নাসিম। এই কার্যক্রম নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দুই পক্ষের মতবিরোধ দেখা দিলেও তা নিরসন হয়েছে বলে জানা গেছে। যাচাই-বাছাই কমিটির একটি সূত্র জানিয়েছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও জামুকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী এখন দরখাস্তকারীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন,কার্যক্রম শেষে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হবে, সেখানে আরো সত্যাসত্য যাচাই করে পরে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। কারো একক কর্তৃত্ত্বে কাউকে তালিকাভুক্ত করা বা বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। আর মুজিব বাহিনী সম্পর্কে কোনোরূপ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যাচাই-বাছাই কমিটির কাউকে দেয়া হয়নি।

একজন ইতিপূর্বে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, নতুন আবেদনকারীদের মধ্যে খুবই অল্পসংখ্যক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা থাকলেও থাকতে পারেন, তবে সংখ্যায় তারা এক শ’র বেশি হবে না।

লেখক: অ্যাডমিন, প্রিয় ঈশ্বরদী ফেসবুক গ্রুপ