প্রধানমন্ত্রীর ঈশ্বরদী সফরের ব্যাপক প্রস্তুতি, নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ঈশ্বরদী

0
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রস্তুতি সভা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল অংশের স্থাপনার কাজ শুরু হচ্ছে চলতি নভেম্বর মাসেই। প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে মূল কাজ শুরুর ৬৮ মাসের মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এ কাজের উদ্বোধন করবেন বলে জানানো হয়েছে। একারণে শুধু রূপপুর প্রকল্প এলাকা নয় গোটা ঈশ্বরদী জুড়েই আনন্দ বিরাজ করছে। পাশাপাশি সমগ্র ঈশ্বরদীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, থানা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষনিকভাবে নিরাপত্তার বিষয়কে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, আগামী ৩০ নভেম্বর প্রকল্পের এ কাজ শুরুর দিনটি দেশের পারমাণবিক বিদ্যুতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য দিন হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ইউরিক মিখাউল খোসলেভ জানান, ২০১৭ সাল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রি-অ্যাক্টর বিল্ডিং মূল পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে সাব বেইজ তৈরি করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে মূল প্রকল্পের ভিত্তিও। অবকাঠামো ছাড়াও আরো অনেক কাজ চলছে। মূল স্থাপনার কাজ শুরু হলে তার পরের ৬৮ মাসের মধ্যেই এখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এদিকে দ্রæত গতিতে এগিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। সরকারের ফাস্টট্র্যাকের প্রকল্পের অধীনে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতিমধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ। চলছে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। এরই অংশ হিসেবে ৩০ নভেম্বর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল স্থাপনার রি-অ্যাক্টর ও বিল্ডিং (উৎপাদন কেন্দ্র) নির্মাণ কাজ। দুই পর্যায় মিলে এক লাখ ১৮ হাজার ১৮০ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০১৩ সালে।
রূপপুর প্রকল্প সূত্র জানান, প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। দুই ইউনিটের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২৪’শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ প্রকল্পের জন্য থ্রি পাস রিঅ্যাক্টর বসবে। যেটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি যা কেবল রাশিয়ায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রয়েছে। বাংলাদেশে ঈশ্বরদীর রূপপুরেই হবে এর দ্বিতীয় ব্যবহার। ২০২০ সালের মধ্যে রিঅ্যাক্টর ভেসেলসহ সব যন্ত্রপাতিই রাশিয়া থেকে আসবে। প্রকল্পের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়ের কারণে এবং রাশিয়ান ফেডারেশনে নির্মিত প্রযুক্তির অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ সেফটি সিস্টেমের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনো ধরনের দূর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবেনা। এরপরও যদি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে কোন দূর্ঘটনা ঘটে এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ সাধারণ জনগণের নাগালের মধ্যে যাবে না। এরই মধ্যে মূল স্থাপনার জন্য সয়েল স্টাবলিস্টমেন্টের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে।
এ সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক বলেন, বাংলাদেশের মাটি তুলনামূলক নরম হওয়ায় যন্ত্রের সাহায্যে মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত সিমেন্ট মিশিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে ১৭ হাজার ৪৫০ কিউবিক মিটার কংক্রিটিং করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা ছিল। কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় ইতিমধ্যে আরো ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ২১৯ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। নতুনভাবে অধিগ্রহণ করা পদ্মার বিশাল চরে চলছে মাটি ভরাটের কাজ। অন্যদিকে মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে তৈরি হচ্ছে গ্রীণ সিটি আবাসন পল্লী। পাবনা গণপূর্ত অধিদপ্তর এগুলো বাস্তবায়ন করছে। ইতিমধ্যে তিনটি সুউচ্চ ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। এ এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ তলা বিশিষ্ট মোট ১১টি ভবন এবং ১৬ তলার আটটি ভবনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে মোট ২২টি সুউচ্চ ভবন নির্মিত হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপপুরে আগমনকে ঘিরে ইতিমধ্যে সর্বাত্বক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহুরুল হক জানান, ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকাসহ পুরো ঈশ্বরদী এখন রয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে। পাবনা জেলা প্রশাসন, ঈশ্বরদী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে প্রায় প্রতিদিনই নানান বিষয়ের ওপর প্রস্তুতি সভা করছেন। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ছাড়াও স্থানীয় আওয়ামীলীগ দলীয় ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, তোরণ নির্মানসহ নানাভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবে ঈশ্বরদীতে। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বুদু ঈশ্বরদীতে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ব্যাপক পোস্টারিং করেছেন।
পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও ভূমিমন্ত্রী আলহাজ্ব শামসুর রহমান শরীফ জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামীলীগের দলীয় সভাপতি, তিনি ঈশ্বরদী এসে যেন দল ও সাধারণ মানুষের ভালবাসায় মুগ্ধ হন সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা দলীয়ভাবে গ্রহণ করবো। ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান মিন্টু জানান, দলীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাসরিন আক্তার জানান, প্রধানমনস্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে প্রশাসিক সকল কার্যক্রম আরো জোরদার করা হয়েছে, সার্বক্ষনিকভাবে সব বিষয়ে মনিটরিং করছে উপজেলা প্রশাসন। ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজিম উদ্দীন জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে পুরো ঈশ্বরদীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। শুক্রবার থেকে ঈশ্বরদীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সব রাস্তায় সার্বক্ষনিক চেকিং করছে পুলিশ। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর আলমগীর জাহান জানান, ইতিমধ্যে ঈশ্বরদীতে বহিরাগত লোকজনদের আগমন বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারী জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদীর সবগুলো আবাসিক হোটেলে বহিরাগত মানুষদের রাত্রিযাপনের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করার পাশাপাশি সকল ক্ষেত্রে গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ টিম সতর্ক নজর রাখছে।