স্কুল-কলেজের পাশে দেড় বছর ধরে সারের স্তুপ

0

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা) // পাবনার ঈশ্বরদীস্থ পাক্শী নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস্ হাইস্কুল ও পাকশী রেলওয়ে ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মত ইউরিয়া সারের ঝাঁঝাঁলো তীব্র গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন পাকশী পেপার মিল এলাকার পাশবর্তিতে বসবাসরত কৃষক ও সাধারণ মানুষ। বৃষ্টির পানিতে গলে যাওয়া ইউরিয়া সার মিশ্রিত পানি ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ার কারনে আশেপাশের ১০ থেকে ১৫ বিঘা ফসলি জমির ফসল ইতিমধ্যে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা জানান, এসব জমিতে গত এক বছর ধরে কোন ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছেনা। এই এলাকার ছোট-বড় শতাধিক গাছও মারা গেছে।

গতকাল সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য গাছপালা মরে শুকিয়ে গেছে। শুকনো ডালপালা নিয়ে বাতাসে পড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে অর্ধশতাধিক মৃত গাছ। নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস্ হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিদিন এই রাস্তায় স্কুলে যাতায়াতের সময় সারের ঝাঁঝাঁলো গন্ধের কারনে তাদের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, সারের তীব্র গন্ধ ক্লাসরুমে পর্যন্ত বাতাসের সাথে চলে আসে। বেশিরভাগ সময় তাদের নাকে রুমাল দিয়ে রাখতে হয়। অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এতে মাঝেমধ্যেই তাদের সন্তানরা নানারকম অসুখে পড়ছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সারের কারনে সৃষ্ট সমস্যা নিয়েই তাদের স্কুল চালু রাখতে হচ্ছে। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসকের নিকট পর্যন্ত নিতে হয়েছিল।

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ শফিকুল ইসলাম শামীম জানান, সারের ঝাঁঝাঁলো গন্ধের সাথে এক ধরনের ক্যামিকেল বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়, এতে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমান কমে যায়। এই ক্যামিকেল মিশ্রিত বাতাস নিশ্বাসের সঙ্গে মানব দেহে প্রবেশ করলে শরীরে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলমান থাকলে ক্যান্সারসহ মারাত্বক ও জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পাক্শী রেলওয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা ইমরুল কায়েস পারভেজ জানান, কলেজ ও স্কুলের সন্নিকটে দীর্ঘদিন ধরে সার স্তুপ করে রাখার কারণে কলেজ ক্যাম্পাসে সারের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, প্রায়ই ছাত্র-ছাত্রীরা এখান থেকে সার অন্যত্র সরিয়ে নিতে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়ে আসছে কিন্তু পেপার মিল কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব জায়গায় সার রাখার কারনে এ বিষয়ে কলেজ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেননা তারা। তবে মৌখিখভাবে মিল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানান অধ্যক্ষ।

মিজানুর রহমান সহ কয়েকজন স্থানীয় কৃষকরা জানান, তাদের ফসলী জমিতে আবাদ বন্ধ হওয়ায় কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন, বিষয়টি পেপার মিল কর্তৃপক্ষ ও বিসিআইসির কর্মকর্তাকে জানানো হলেও প্রায় দেড়বছর ধরে এবিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বিসিআইসি কিংবা পাকশী নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস্ লিঃ কর্তৃপক্ষ।

পাকশী পেপার মিলস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যীশু বিকাশ চৌধুরী এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, বিসিআইসির পক্ষ থেকে ২০১৬ সালের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত পাকশী পেপার মিলে গুদামজাত করা এবং এখান থেকে রি প্যাকিং করে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার জন্য সাড়ে চার হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার এখানে রাখা হয়েছে। মিলের পক্ষ থেকে এই সার বিসিআইসির অনুমতি ছাড়া সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তাদের হাতে নেই। মিলের অভ্যন্তরে এত বিপুল পরিমান সার রাখার স্থান সংকুলান না হওয়ায় নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস্ লিঃ হাইস্কুলের কাছে মিলের পরিত্যক্ত কলোনীর মধ্যে স্তুপ করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিসিআইসির ডেপুটি ম্যানেজার (সেলস্) ইকবাল আমির রতন এ বিষয়ে বলেন, মিলে ও মিলের বাইরে যে সব সার রাখা হয়েছে তা এখান থেকে রি-প্যাকিং করে আশেপাশের এলাকায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে, কিন্তু সম্প্রতি ডেলিভারী প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে এখানে দীর্ঘদিন ধরে সার রেখে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কবে নাগাদ এসব সার এখান থেকে সরানো হবে তা বলতে পারেননি তিনি।