ঈশ্বরদীর মেয়ে মাহমুদা ‘নাসা’র বর্ষসেরা উদ্ভাবক হলেন

0

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঈশ্বরদী ডটকম// ঈশ্বরদীর সলিমপুর ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম জয়নগর। কে ভাবতে পেরেছিল- এখানে জন্ম নেওয়া মাহমুদা সুলতানা মুনমুন নামে এক তরুণীই এক সময় বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরবেন জয়নগর তথা বাংলাদেশের নাম! কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জটিল গণ্ডি পেরিয়ে ন্যানো ম্যাটারিয়াল ও মহাকাশে ব্যবহারযোগ্য কোয়ান্টাম ডট স্পেক্ট্রোমিটার ডিভাইস আবিস্কার করে এরই মধ্যে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানী মাহমুদা। তারই স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসার আইআরএডি বর্ষসেরা উদ্ভাবক নির্বাচিত হয়েছেন মাহমুদা।

একই সঙ্গে নাসার সাময়িকী ‘কাটিং এজ’-এর সাম্প্রতিক ইস্যুর প্রচ্ছদ প্রতিবেদনও করা হয়েছে মাহমুদাকে নিয়ে। মূলত নাসার অধীনে গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারস ইন্টারনাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআরএডি) কর্মসূচির আওতায় যেসব বিজ্ঞানী বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন, তাদেরকে বার্ষিকভাবে এ খেতাব দেওয়া হয়। এ বছর এই কর্মসূচিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবন কাজে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে মাহমুদা এ খেতাব জিতে নিলেন।

মাহমুদাকে নিয়ে নাসা কর্মকর্তারাও উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন, এত কম বয়সী কোনো মেয়েকে এর আগে তারা নাসায় কাজ করতে দেখেননি। নাসার প্রধান কর্মকর্তা পিটার হিউজেস বলেন, মাহমুদাকে আমরা বর্ষসেরা উদ্ভাবক মনোনীত করতে পেরে গর্বিত। কারণ সে নাসার যে ক’টি কাজে অংশগ্রহণ করেছে, তার প্রত্যেকটিতেই দিয়েছে অসাধারণ সৃজনশীলতার পরিচয়। তার চমৎকার পারদর্শিতায় আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই মাহমুদা নাসার একজন ন্যানো টেকনোলজি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠবে।

মাহমুদার বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে। স্বাভাবিকভাবেই সলিমপুর গ্রামের এ তরুণীর এমন অর্জনে এখন উচ্ছ্বসিত ঈশ্বরদীর সর্বস্তরের মানুষসহ মাহমুদার খেলার সঙ্গীরা। মাহমুদার বাবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ে নাসার আইআরএডি বর্ষসেরা উদ্ভাবক মনোনীত হওয়ায় খুবই আনন্দিত। এখন এলাকার মানুষের কাছে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা অন্য রকম সম্মানিত বোধ করছি।’

মাহমুদার চাচা ঈশ্বরদী উপজেলা চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান মিন্টু বলেন, ঈশ্বরদীর জয়নগর গ্রামের মেয়ে হয়ে আমার পরিবারকে মাহমুদা অনন্য উচ্চতার আসনে আসীন করেছে। এতে জয়নগর গ্রামবাসী শুধু নয়; সমগ্র ঈশ্বরদীবাসী গর্বিত।

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক উদয়নাথ লাহিড়ী বলেন, একটি অজ পাড়াগাঁয়ের তরুণী হয়েও যে কেউ পৃথিবীর সেরা একজন মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে- মাহমুদা তার অনন্য দৃষ্টান্ত। চাচাতো বোন লাবনী ইসলাম জানান, মাহমুদা জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করত। ছোটবেলা থেকেই ও ছিল অসাধারণ মেধাবী। সে সব সময় নতুন কিছু নিয়ে ভাবতে ভালোবাসত।

মাহমুদার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কিশোরী বয়সেই মাহমুদা যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। এর পর ২০১০ সালে মাহমুদা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পিএইচডি লাভ করেন। একই বছর এক জব ফেয়ারে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি নাসায় কাজের সুযোগ পান। তার বড় চাচাও নাসার এমস রিসার্চ সেন্টারে ফিজিসিস্ট হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে মাহমুদা ও তার দল এমআইটির অধীনে প্রোটোটাইপ ইমেজিং স্পেক্ট্রোমিটার তৈরিতে কাজ করছেন।

কোয়ান্টাম ডট স্পেক্ট্রোমিটার কী?
কোয়ান্টাম ডট বা বিন্দু মূলত অর্ধপরিবাহী এক ধরনের ন্যানোক্রিস্টাল, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এটি আবিস্কার হয় ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে। এই বিন্দুর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো, এর আকার ও রাসায়নিক গঠনের ওপর নির্ভর করে তা আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য কতটুকু শোষণ করবে। সাধারণত স্মার্টফোনের ক্যামেরা, মেডিকেল ডিভাইস এবং পরিবেশগত পরীক্ষার সরঞ্জাম তৈরিতে এই ন্যানোক্রিস্টাল ব্যবহূত হয়।

এ বিষয়ে মাহমুদা বলেন, আমি বিশ্বাস করি, মহাকাশে ব্যবহারযোগ্য এই ক্ষুদ্রাকৃতির স্পেক্ট্রোমিটারের আকার আরও ক্ষুদ্র করার পাশাপাশি এর আরও উৎকর্ষ সাধন সম্ভব। এর ফলে এই প্রযুক্তি কৃত্রিম উপগ্রহ ও যেসব স্থানে মানুষ যেতে পারে না সেখানে পাঠানোর ক্ষুদ্র যানবাহনে ব্যবহার করা সহজ হবে। মাহমুদার তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতির স্পেক্ট্রোমিটারে শোষণ বর্ণালিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এই যন্ত্রে মহাকাশের ধূলিকণা ও গ্যাসীয় পদার্থ থেকে বিকিরিত আলো কতটা শোষণ হলো, তা পরিমাপ করা হয়েছে, যা থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া সম্ভব।