কেবল নির্বাচিত পাঠের মধ্য দিয়ে কেউ পাঠক হতে পারে না: মজিদ মাহমুদ

0
338

কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?

মজিদ মাহমুদ: কবিতা কেন লেখন— এ ধরনের প্রশ্ন সম্ভবত কবিরা কখনো করেন না; এমনকি কবিতার অনুরাগীদেরও করার দরকার হয় না; তবে কবির ভক্তকুল কিংবা মিডিয়ায় কবির সাক্ষাৎকার গ্রহিতারা হরহামেশা করে থাকেন। এ ধরনের প্রশ্ন কেবল কবিকে নয় সব পেশা ও দাতব্য কর্মীদেরও করা যায়; যেমন ‘কবিতা’ শব্দটি বদলে ফেলে বেশ্যা কিংবা ধর্মপ্রচারককেও একই প্রশ্ন করতে পারেন। যদিও এ দুই ক্ষেত্রে উত্তর হবে দুই রকম; তবু দুটির সঙ্গেই ব্যক্তির লাভালাভের ব্যাপার আছে। প্রথম কর্মটির মাধ্যমে আপনার শরীর রক্ষিত হবে এবং দ্বিতীয় কর্মটির মাধ্যমে মরণোত্তর আত্মা। তাই বলে একই মাত্রায় যদি বিষয়টি নামিয়ে আনেন তাহলে আগামীকাল রাজপথে অথবা গুপ্তঘাতকের হাতে আপনার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ভালোমন্দ বলে অবশ্যই কিছু একটি আছে। যদিও দুনিয়ায় কোনো কিছু সরল নয়; সবকিছুরই একটি বায়োনারি পজিশন আছে। যাক, ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নাই।

আপনার এই ১ নম্বর প্রশ্নটির মধ্যে পাঁচটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আমি যদি বলি কেন কবিতা লিখি— ‘তা বলতে বাধ্য নই’— তাহলে তো খেল-খতম— আপনার সঙ্গে আমার বাতচিৎ জমে উঠবে না; যদি বলি বাধ্য— তাহলে মনে হবে আমি যেন কোনো বসের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কবিতা লিখতে এসেছি। আসলে বাধ্যবাধকতার ব্যাপার নয়; আমি কবিতা লিখছি এটিই সত্য। আর সকল পেশা ও নেশার মানুষকেই তার কাজের সপক্ষে যুক্তি তৈরি করতে হয়। আর একই পেশা ও শ্রেণীর মানুষের জন্যই কালে-কালে তার উত্তর পরিবর্তিত হয়ে যায়; তার ব্যাখ্যা ও বয়ান পাল্টে যায়। যেমন ধরুন যদি এই প্রশ্নটি চর্যাপদের কবিদের করা যেতো তাহলে উত্তর হতো এক রকম, আবার মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের কবিদের করা হতো তাহলে উত্তর হতো আরেক রকম। সুতরাং সবকালে কবি একই ধরনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবিতা রচনা করেন নাই; যদিও আমরা কবি বলতে একই ধরনের কর্তব্যের মধ্যে নিয়ে আসতে চেষ্টা করি। এটি আসলে কালের শিক্ষা; বলা যায়, মর্ডানিটির শিক্ষা। মর্ডানিটি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরলেও সবকিছুর একটি নিয়ম বেঁধে দিয়েছে; যেভাবে মধ্যযুগে ধর্ম বা সংঘ দিতো। সংঘ ও ধর্মের বাইরে গেলে যেমন আপনি পতিত কিংবা জাহান্নামি হয়ে যাবেন; তেমনি মর্ডানিটির নিয়ম ব্রেক করলেও আপনার সকল সুকৃতিকে তারা নেই করে দেবে। সুতরাং তিনকালের কবিতা তিন রকম। চর্যাপদের কবিরা তাদের রচনায় বৌদ্ধধর্মের আচার অনুষ্ঠানের গূঢ়ার্থ নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন; মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের কবি কিংবা রোমান্টিক প্রণোপাখ্যানের কবিরা অতিলৌকিক জগতের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছেন তাদের কাব্যে; আধুনিক কবিরাও তেমন একটা গূঢ়ার্থ রচনার চেষ্টা করছেন। ব্যক্তি কবি যদিও নিজে আলাদা কিছু দাবি করে তবু সে তার কালের বাইরে আসতে পারে না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে কাল কিভাবে ভিন্ন হয়ে গেল। আসলে এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া; বিশেষ করে মানুষের কৃৎকৌশলের পরিবর্তনের সঙ্গে, তার শ্রমশক্তির নবকরণের সাথে সাথে কবিদের কল্পনার জগতও আলাদা হতে থাকে; কবি যেমন নিজেকে প্রকাশ করেন তেমন জনমনোরঞ্জন কিংবা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাও তার অন্যতম লক্ষ্য।

আমি কেন কবিতা লিখি— এ প্রশ্নের জবাব খুব সহজ। আমি কবি তা-ই কবিতা লিখি। কিন্তু আসলে এই প্রশ্ন কি এতো সরল; এই প্রশ্নাংশের মধ্যেও রয়েছে অনেক প্রশ্ন, তার একটি হতে পারে— আমি কেন কবিতা লিখতে আসলাম, আবার আমি কবিতায় কী লিখি অর্থাৎ আমার কবিতা কী ধরনের কমিটমেন্ট পালন করে। তাছাড়া এই যে বললাম— আমি কবি তাই কবিতা লিখি— এ কথার কি কোনো অর্থ হয়। জন্মগতভাবে কি কেউ কবি হতে পারে? ধরুণ আধুনিককালে কেউ লিখতে পড়তে জানলো না; কবিতা-টবিতা পড়ল না— সে কি কবি হতে পারবে? সম্ভবত কবিতা লেখা এক ধরনের ঝোঁক। কেউ কেউ কোনও একটি কাজ করতে হঠাৎ উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং তার মধ্যে ভালো লাগা তৈরি হতে থাকে; আর সেই সঙ্গে যদি কিছু প্রশংসা প্রাপ্তি যোগ হয়— তাহলে কাজটি আরো কিছুদূর এগিয়ে চলে। তবে কবিতা লেখার পক্ষে আমার লেখক জীবনে অনেক বাক্য রচনা করেছি। আমার একটি গদ্য রচনা আছে— ‘কেন কবি কেন কনি নয়’ গ্রন্থে— তার শুরুটা ঠিক এমন— ‘কবিতা জীবনের টুকরো গল্প— কবিতা না লিখলে মানব জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’ এ রচনাটি পাঠ করে আমার এক কবিবন্ধু ভীষণ ক্ষেপে গেলেন— এই বাক্যের যুক্তিশীললতা নিয়ে। তিনি বললেন, তার বাবা কবিতা লেখেননি— তাই বলে কি তার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। কি মুস্কিল, তাই তো। কিন্তু তার বাবার জীবন যে সম্পূর্ণ ছিলো তা তিনি কী ভাবে জানলেন! আসলে কবির জীবনও আর পাঁচজনের জীবনের মতো অসম্পূর্ণ। কিন্তু কবি এই অসম্পূর্ণতার যন্ত্রণা ধরতে চেষ্টা করেন। আর এই টুকরো টুকরো ব্যথা-বেদনা, প্রেম ও সংগ্রামশীলতার ইতিহাস মানুষকে কিছুটা কাছে টানে। আর এটাই হলো আমার কবিতা লেখার কারণ।

‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’— এই ‘কেউ কেউ’ বা ‘কারও কারও’ কবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনও ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?

মজিদ মাহমুদ: ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’— এই বাক্যবন্ধটি কিভাবে বাংলাকাব্যাঙ্গনে প্রবেশ করেছে তা কেবল কবি নয় প্রকৃত কবিদের হেয় করার জন্যও অকবিরা ব্যবহার করে থাকেন। আমার মনে হয় জীবনানন্দ দাশ নানা মানসিক যন্ত্রণায় সংক্ষুব্ধ হয়ে এই মন্তব্যটি তার একটি প্রবন্ধ জাতীয় রচনায় ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। যদিও এটি সত্য জীবনানন্দ দাশ প্রবন্ধ লিখতে জানতেন না। তবু একজন অবসেশনাল কবি হিসাবে তার সকল কথাই পরবর্তীকালের কবিদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। এই গুরুত্ব কেবল তিনি ভালো লিখেছেন সে জন্য নয়; তিনি আসলে যিশুর মতো কষ্ট সহ্য করেছেন, এককীত্বের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, কথিত সমকালীন বয়স্য ও পরিজন দ্বারাও কমবেশি নিগৃহীত হয়েছেন; আবার ট্রামাহত হয়ে যন্ত্রণাময় মৃত্যুর পরে কবি খ্যাতিও পেয়েছেন— আর এসবই পরবর্তীকালের বিবিক্ত অসহায় কবিদের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে যাই হোক, এবার আমি এই বাক্যটি নিয়ে দুএকটি কথা বলতে চাই; আগেই বলেছি এটি কোনো যুক্তিপূর্ণ কথা নয়। ইংরেজিতে একে বলে জেনারালাইজ করা, বাংলাতে কেউ বলে সামান্যিকরণ বা সাধারণীকরণ। যেমন সব পেশার ক্ষেত্রেই কি এই মন্তব্যটি সমানভাবে ব্যবহার করা যায় না? উদাহরণ দেয়া যাক: ‘সকলেই দার্শনিক নয়, কেউ কেউ দার্শনিক, ‘সকলেই বিজ্ঞানী নয়, কেউ কেউ বিজ্ঞানী।’— এভাবে সকল পেশা সম্বন্ধেই আপনি বলতে পারবেন। তাহলে কবির জন্য তো এটি স্পেশাল কিছু থাকলো না যে— একজন কবিকে এই বাক্যের তোয়াক্কার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

কবি হওয়ার জন্য ঐশিপ্রাপ্তির বিষয়টি একটি দৈবাৎ। যদিও কবি হওয়ার এই তত্ত্ব আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না। তারপরেও একটি সামন্যিকরণ ধারণার মাধ্যমে এই তত্ত্বের পক্ষেও দাঁড়ানো যায়। পৃথিবীতে মানুষের আসাটাই কি একটি দৈবাৎ নয়। ধরুণ একজন নামডাকওয়ালা কবি তার নিজের জন্মের ব্যাপারে কি তার হাত ছিলো? যে জন্মালো না সে কিভাবে কবিতা লিখবে? জন্মালো অথচ লেখাপড়া শিখলো না তাহলে সে কিভাবে লিখবে? যদি বিষয়টি ঐশি হতো তাহলে লেখাপড়া শেখার কোনো দরকার হতো না, উম্মি হলেই চলতো, জগতের কোনো পয়গম্বর-অবতারকে লেখাপড়া শিখতে হয়নি; তাদের জন্য ঐশিতত্ত্ব চালু আছে। সুতরাং কবির জন্য এই তত্ত্বটি অসার। তাহলে প্রশ্ন মানুষ কবিতা লিখতে আসে কেন? আসলে এটি একটি ঝোঁক বা প্রবণতা। মানুষের মস্তিষ্কে এমন সব রসায়ন থাকে, নানা মিথস্ত্রিয়ায় তা প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা হয়তো তা বলতে পারবেন। কোনো একটি প্রবণতাই তাকে এ পথে নিয়ে আসে। এমনকি যারা লিখতে পড়তে জানেন না তাদের মধ্যেও এই ঝোঁক থাকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশেষ করে মরমী কবিদের অনেকেরই অক্ষরজ্ঞান ছিলো না। তাতে তাদের ওই মাত্রায় কবি হওয়ার পথে অন্তরায় ছিলো না। যিনি কালক্রমে কবি হন তিনি আসলে প্রথমত তার মানসিক ঝোঁকের সঙ্গে কবিতার পথে এগুতে থাকেন। প্রথম পর্যায়ে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশের আনন্দে সে বিভোর থাকে। পরবর্তীকালে তার বয়স্যদের এপ্রিসিয়েশন তাকে এই কাজে নিযুক্ত থাকতে সহায়তা করে। কারণ, একজন মানুষ কেবল নিজেই লেখেন না, তার পাঠকবর্গও তার সঙ্গে এগিয়ে চলে। কোনো কবির পক্ষে যদি তার পাঠকের সমীহ না জোটে তাহলে তার কবিজীবন ব্যর্থ হতে বাধ্য। এ নিয়ে সাহিত্যের তাত্ত্বিকদের মধ্যে অনেক বিতর্ক রয়েছে। আসলে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ— লেখক না পাঠক?

তবে এই যে রেওয়াজের কথা বললেন অর্থাৎ সাধনা। হ্যাঁ, অবশ্যই কঠোর সাধনা ও সংগ্রামশীলতাই কেবল একজন কবির পথে আগত ব্যক্তিকে শক্তিশালী কবি ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে পারে।

 

এখনকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কারণ কী বলে মনে হয় আপনার? কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু? কবিতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?

মজিদ মাহমুদ: এখানকার কবিদের ছন্দবিমুখতার কথা অবশ্য আমার জানা নাই। ছন্দ জিনিসটাই বা কী— যা নিয়ে একজন কবিকে কথা বলতে হবে। ছন্দ তো কবির সহজাত অধিকার। ছন্দের প্রাথমিক অনুভূতি যার মধ্যে আসে নাই সে কিভাবে কবিতা লিখতে আসবে। আসলে কারো মধ্যে যখন কবিতা লেখার বিষয়টি ঘটে গেল তখনই তার মধ্যে ছন্দের অনুভূতি জন্ম হলো। ছন্দানুভূতি ছাড়া তো কেউ কবিতা লিখতে আসে না। রবীন্দ্রনাথ ভাষাছন্দ কবিতার মধ্যে বাল্মীকির কবি হওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন— হঠাৎ করে মিথুনরত কঞ্চুযুগলের বিরহকাতরতা দেখে চোর রত্মাকরের মধ্যে এক অজানা বেদনার জন্ম হয়— আর এই অজানা বেদনার প্রকাশ সর্বদা ছন্দবদ্ধ বাক্যতেই ঘটে। তাই বলে ছন্দ মানে অনুপ্রাস— এটি ভাবলে ভুল হবে। এমনকি বাংলা ভাষায় প্রচলিত তিনটি ছন্দ প্রকরণ জানাই কেবল ছন্দ জানা নয়। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও ছন্দ কখনো একমাত্রায় থাকেনি। মধ্যযুগের কবিতায় একটিই ছন্দ ছিল— সেটি হলো অক্ষরবৃত্ত— পয়ার কিংবা এরই কয়েকটি রকম ফের। মাইকেলে এসে অক্ষরবৃত্তের চাল পরিবর্তন হয়ে গেল, পয়ারের পরিবর্তে প্রবাহমান অমিত্রাক্ষর ছন্দের জন্ম হলো। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের হাতে কিংবা তাদের উত্তর সাধকদের নিরন্তর চর্চায় ছন্দের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন টানা গদ্যে কবিতা লেখা হচ্ছে। কিন্তু টানা গদ্যই যে উৎকৃষ্ট কবিতা রচনার অন্যতম উপায়— এ কথা প্রায় দুশোবছর আগে বাংলা উপন্যাসের সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মনে হয় ছন্দে নয় উৎকৃষ্ট গদ্যের মাধ্যমেই উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা হওয়া সম্ভব’। একটা কথা মনে রাখতে হবে, ছন্দ কখনো কবিতা নয়— ছন্দ হলো পরিচ্ছেদ। কবিতা হলো এমন একটা শিল্পকর্ম যা মানুষের হৃদয়ের মধ্যে জন্ম হয়— বেরিয়ে আসে ছন্দের পোশাক পরে; আর সেই পোশাক হলো কালের পোশাক— যেভাবে যুগেযুগে মানুষের পোশাকের বিবর্তন আসে ছন্দেরও সেভাবে পরিবর্তন আসে। তবে যতই পরিবর্তন হোক পোশাক যেমন পরতে হয় তেমন একজন কবিকেও একটি আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে তার কবিতা সম্পন্ন করতে হয়। পোশাক যেমন আমাদের পরিবর্তন করতে হয় ছন্দও পরিবর্তন করতে হয়। ঈদের নামাজ ও জানাজায় যে পোশাক পরে আমরা যাই, বিয়ে বাড়িতে সে পোশাকে যাই না। একজন কবির কাছেও পুরনো নতুন সব ধরনের ছন্দ থাকতে হবে, সকল ছন্দে সে পারদর্শী হলে প্রয়োজনীয় পোশাকটি সময় মতো পরে নিতে পারবেন।

এক সময় আমাকেও বলা হতো— আমি ট্র্যাডিশনাল ছন্দ খুব একটা ব্যবহার করিনি। কিন্তু যখন আমি দেওয়ান-ই-মজিদ লিখলাম তখন তো আমার ট্র্যাডিশনাল ছন্দে ফিরে না যাওয়ার উপায় ছিলো না। এই ছন্দ ব্যবহার করতে যেয়ে মনে হলো— এই ছন্দ কতই না সহজাত আয়ত্ত ছিলো আমার। দুএকটা জায়গায় ছন্দপতনও ঘটেছে— তা নতুন করে মেরামত করতে যাইনি। অনেকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন; আমি ভাবি যে শিল্প কর্মের মধ্যে মানুষ ত্রুটি খুঁজে পায় না, সেই শিল্পকর্ম মানুষ হৃদয়ে নেয় না।

দশকওয়ারী কবিতা মূল্যায়নের প্রবণতাটিকে কিভাবে দেখেন? আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?

মজিদ মাহমুদ: বর্তমান সময়ে ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলা কবিতায় দশক বিভাজন অনিবার্য ও দুষ্টগ্রহ হিসাবে জারি আছে। এর অপতৎপরতা এতই প্রবল যে একজন কবির চাওয়া না চাওয়ার উপর এটি মোটেও নির্ভর করে না। অধিকাংশ তরুণ কবির সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারবেন, তারা দশকের শৃঙ্খলটি মানতে চান না; আবার তারাই নিজেকে দশকের মধ্যে ফিট করার জন্য নানা রকম ফন্দি-ফিকির করে থাকেন। তবে এটাও ঠিক যারা দশকের বাইরে ছিটকে পড়েন তাদের কবি মহলে সহজ পরিচিতিটা আসতে বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু দশক দিয়ে কিভাবে কবিতার বিচার হতে পারে তা আমার বুঝে আসে না। সবাই মিলে কবিতা লেখে বটে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর নির্ভরশীল। ঢাকায় প্রায়ই আমরা লক্ষ্য করি— একটি দশকীয় রাজনীতি জারি আছে। কোন কবি কোন দশকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে সে ব্যাপারে সে নিজে ও তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ যেন নিজে কবে জন্মাবে তার দিনক্ষণ ঠিক করা। আচ্ছা ধরুণ, কোনো কবি দশকের শুরুতে আবির্ভূত হলেন, আবার কোনো কবি দশকের একেবারে শেষপাদে— তাহলে এই দুই কবির দশকের উপস্থিতি কিভাবে একমাত্রায় বিবেচিত হবে। এতে দেখা যায়— দশকের সবচেয়ে দুর্বল কবি বহুদিন ধরে আলোচিত হতে হতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, হয়তো প্রতিভাবান কবি শেষে আসার কারণে কম উচ্চারিত থেকে যান। তাছাড়া এই রাজনীতিটা মূলত করে থাকে দুর্বল ও মাঝারি কিসিমের কবিরা। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করে থাকে প্রধানত লিটলম্যাগের সম্পাদকরা; অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবি নিজেও লিটলম্যাগের রাজনীতিতে জড়িয়ে থাকেন। বিভিন্ন শিরোনামে প্রকাশ করতে থাকে— অমুক দশকের প্রধান কবিগণ, অমুক দশকের সক্রিয় কবিগণ— এবং সকল ক্ষেত্রেই নিজের প্রাধান্যকে ধরে রাখতে চান। এইভাবে নতুন আসা কাব্যযশপ্রার্থী তরুণদের মধ্যে নিজেকে বিস্তার করতে থাকেন। আসলে দশকের বিষয়টি বাংলা কবিতায় জেঁকে বসেছিলো গতশতাব্দির তিরিশ দশকে; কারণ তখনকার কবিরা এটি একটি সম্মিলিত কাব্যান্দোলন হিসাবে নিয়েছিলেন; মূলত রবীন্দ্রনাথ থেকে নিজেদের ক্ষুদ্রপ্রচেষ্টাকে আলাদা করা; এমনকি নজরুল থেকেও। তিরিশ দশক বলতে তখন কেবল একটি দশককে বোঝাতো না— একটি কাব্যান্দোলনকেও বোঝাতো।

আমার দশকের অন্য কবিদের কবিতা থেকে আমি কিভাবে আলাদা— এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে আসলে কোনো আড়াল থাকে না। যা-ই কিছু একটা বলা হোক না কেন— মনে হবে এটি নিজেকে বিশিষ্ট করে তোলার একটি প্রবণতা। তবে যারা আমার কবিতা পড়েছেন তারা সহজেই সেই পার্থক্যটি করতে পারবেন— অবশ্য আমি জানি না। এই পার্থক্য হয়তো সকল কবিরই সহজাত অধিকার। কবিতা মূলত কবির হৃদয়ের অধরা মূর্তি। মানুষের চেতনা ও উপলব্ধির সাথে কবিতাও আলাদা হতে থাকে। আমি বহুবার কাব্যপাঠকের কাছে শুনেছি— এমনকি কোনো কোনো সমালোচক এমনটিও লিখেছন, তারা নাকি এমন কবিতা আগে কখনো পড়েননি। এ কথার অর্থ এই নয় যে— আগে পড়েনি বলে ভালো বা শ্রেষ্ঠ— আগে না পড়ার মানে নতুন ধরনের। তবে বোর্হেস বলেন, মানুষের পক্ষে নাকি এখন আর নতুন কিছু লেখা সম্ভব নয়। আমি অবশ্য জানি না, এর হয়তো গভীর অর্থ আছে। কারণ আমি তো আর শব্দ ও সমাজ উৎপাদন করিনি— সে সবের শরণাপন্ন তো হতেই হচ্ছে। তবু মোটা কথায় বলা যায়, নতুন করে বলার না থাকলে তো সৃষ্টিশীলতা হলো না— লেখারই বা দরকার কী। আমার কবিতা কিভাবে আমার দশক থেকে আলাদা এই পরীক্ষা আমি আপনাদের কাছে দিতে রাজি নই; কোনো ছাত্রটাত্র জোগাড় করে তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। তবু দুএকটি ক্লু ধরিয়ে দিই— আমি যখন ‘মাহফুজামঙ্গল’ লিখছি— সেই ১৯৮৯ সাল প্রায় সিকি শতাব্দি আগের ঘটনা; ইতোমধ্যে যে বাইটির হাফ ডজন সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। সেই সময়ে কিন্তু আধুনিক কবিতার ধরণ এমন ছিলো না; এমনকি আমাকে অনেকে এ ব্যাপারে অভিযোগও করেছেন। কিন্তু পঁচিশ বছরের প্রেক্ষাপটে অনেক নামি লেখকরাও এটি ব্যবহার করছেন; কিংবা আমার বিভাজন নাকরা ভূখণ্ড তাদের পছন্দ হয়েছে। যেমন আমি সাহিত্যের দশক বিভাজন কেন, যুগ বিভাজনেও তো আস্থা রাখি না। সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতাদের কাছে আমার প্রশ্ন রাখতে ইচ্ছে করে— এই যে বাবা, তোমাদের এই বিভাজনটা কে শেখালো। কে বললো এটি প্রাচীন যুগ, আবার কে-ই বা বললো এটি মধ্য বা আধুনিক যুগ। কাল তো বহমান, মানুষ কেবল আসছে যাচ্ছে আর কৃৎকৌশলের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। কিন্তু কালের বিভাজন একটি সঙ্কীর্ণ বা ক্ষমতাবাদি রাজনীতি হিসাবে থেকে যাচ্ছে। এতে সমস্যা হলো, যেই আপনি আধুনিকতার মার্কা মেরে দিচ্ছেন— সেই অন্যরা তার বাইরে যাওয়া রীতিমত পাপ মনে করছে। মনে করছে আধুনিক হতে না-পারা যেন ব্লাসফেমির মতো অপরাধের শামিল। আমি আমার কবিতাতে এসব আধুনিক-ফাধুনিককে পাত্তা দিতে চাইনি। যা আধুনিক ছিলো না তাও আমাকে ভাবিয়েছে আবার যা আধুনিক তাও হয়তো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আর আমার কবিতার শক্তি বা দুর্বলতা এখানেই।

তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত— প্রত্যেকটি দশক থেকে যদি তিনজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে— কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

মজিদ মাহমুদ: দশকওয়ারি নাম বলার ঝুঁকিটা কেন আমাকে নিতে বলছেন? দশকওয়ারি নাম বলতে পারি; কিন্তু তাতে লাভ হবে কার? বই বিক্রেতার না কবির না পাঠকের? এই পথটি তো এতো সহজ নয়। পাঠক তো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার নাম। কেবল নির্বাচিত পাঠের মধ্য দিয়ে কেউ পাঠক হতে পারে না। পাঠক নিজেই তার ভালোমন্দ আবিষ্কার করে নেয়। তিরিশ দশকে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলও লিখেছেন; আবার তথাকথিত পঞ্চপাণ্ডবও লিখেছেন। আবার ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই’ কিংবা ‘অন্ধবধূ’র মতো কবিতা লেখা হচ্ছে কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্রও এ সময়ে কবিতা লিখছেন। বাংলা কবিতার প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি সম্ভবত এই তিরিশের দশক থেকেই শুরু। জ্ঞানে হোক, অজ্ঞানে হোক তিরিশের কবিতার কথা বললেই অবশ্যম্ভাবীভাবে পঞ্চপাণ্ডবের নাম চলে আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন তো থেকেই যায়— সবাই কি একই মাত্রায় ভালোলাগার মতো কবি। আমার তো মনে হয় না, কেউ আজ আর কবিতা পাঠের আনন্দের জন্য অমিয় চক্রবর্তী, এমনকি বিষ্ণু দে পড়েন না, এ তালিকা থেকে বুদ্ধদেববসু কিংবা সুধীন্দ্রনাথও বাদ পড়বেন না। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক একটি এলিটিসিজম তাদের ধরে রেখেছে। এবার বাকি থাকলো জীবনানন্দ দাশ। তরুণেরা এখনো তার কবিতা পড়ে, প্রেমিকেরা এখনো ‘বনলতা সেনে’র মতো অপ্রেমের কবিতা আবৃত্তি করে। বাংলা কবিতার অবসেশন হিসাবে এখনো তিনি রয়ে গেছেন। কিন্তু আমার কাছে কখনো তাকে তেমন মনে হয়নি, যেমন করে তিনি টিকে আছেন। কবিতার পাশাপাশি একজন ব্যর্থ মানুষের সফলতা, নাগরিক অসফল নিঃসঙ্গ জীবন— যিশুখৃষ্টের মতো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্তত তার কষ্টময় সফল জীবনের প্রত্যাশা কবি যশোপ্রার্থীদের বাঁচার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে রাখে। দেখুন না একজন মানুষের চুয়ান্ন পঞ্চান্ন বছর পর্যন্ত কী হাল, যেই না ট্রাম তাকে ‘ক্রসিফাই’ করলো ওমনি কাব্যপাঠকের আদিখ্যেতা তার উপর হামলে পড়লো। তিনি তো বেঁচে থাকতেও ওইসব কবিতাই লিখেছিলেন। তিনি আরেকটি সুবিধা পেয়েছিলেন, সেটি হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ— তার ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থটি এই পর্বে তাকে কিছুটা তুলে এনেছিলো। তবু বলুন তো, যদিও জীবনানন্দ দাশ এ সব কবিতাকে বলতে চেয়েছেন— ইতিহাসের সময়চেতনা থেকে তিনি রচনা  করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে জীবন্ত বাংলাদেশের উপস্থিতি নেই। রূপসী বাংলায় কোথও দেখবেন না এক ফোঁটা বৃষ্টির শব্দ। অথচ এই কবি যেখানে জন্মেছিলেন— সেই বরিশালে বর্ষাকালে কি ভয়াবহ দুর্ভোগই না হতো। অথচ চর্যাপদ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিয়ে কাব্যগ্রন্থ দেখুন, বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখুন, কি দুর্দান্ত সেই অনুভূতি। আমি শুধু আশ্চর্য হই— এখনো যখন তরুণদের কারো কারো কবিতায় জীবনানন্দ দাশের অসংখ্য ফ্রেজ ও ইডিয়মের ব্যবহার দেখি। তখন আমার বলতে ইচ্ছে করে— ধরণী দ্বিধা হও। যারা এককালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলা কবিতাকে আলাদা করেছিলেন সেই তাদেরই উত্তরসূরীরা কি অন্ধভাবেই না তাদের অনুকরণ করছে। আমি বলতে চাই, জীবনানন্দ দাশের এই অবসেশন থেক বেরিয়ে না এলে বাংলা কবিতার মুক্তি নাই।

এমন বক বক ভালো লাগছে না; তবু বলি ভাই, চল্লিশেও কয়েকজন শক্তিশালী কবি এসেছিলেন এই বাংলায়— নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে সুভাষ, সুকান্ত, গোলাম কুদ্দুস, সমর সেন, ফররুখ, আহসান হাবীব, আলী আহসান— কোনো না কোনোভাবে স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী।

পঞ্চাশের বাংলা কবিতা তো সর্বকালের সেরা। রবীন্দ্র-নজরুলের পরে সম্ভবত বাংলা কবিতায় এতো সোনা কখনো ফলেনি। এর কারিগর— শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ছাড়া আর কে-ই বা। তবে এর সঙ্গে শক্তির নাম জুড়ে দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশকে কেউ যদি কোনো কালে চিনতে চায়, তারা যেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের কাছে ফিরে যায়। তবে ওমর আলী, বিনয়, সুনীল, উৎপলকেও কাব্যপাঠকরা একেবারে বাদ দিতে চান না।

ষাট ও সত্তর দশক আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশক। বাংলা কাব্যে একসঙ্গে এতো কবি আর কখনো কাব্য রচনা করেননি। সব দশকেই কিছু প্রতিভাবান কবি থাকেন— এ দুই দশকে প্রতিভাবান কবির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বরং বাংলাদেশের কবিতা জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ষাট দশকের ভূমিকা ছিলো সর্বাধিক। তাছাড়া পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একটি জাতীয়তাবাদি চেতনা নির্মাণে ষাট ও সত্তর দশকের কবিদের অবদান ছিলো সর্বাধিক।

আশির দশকটি আমার নিজের দশক। তবে আমি আশির কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। লোকজন সম্প্রতি আমাকে আশির দশকের কবি বলেই উল্লেখ করেন। অনেক সংকলন-টংকলনেও আমার কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেন। অবশ্য খুব বেশি নয়। আমিও বিষয়টি মেনে নিয়েছি। তবে আশির তথাকথিত মূলধারার সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ ছিলো না। যেমন একবিংশ কিংবা গাণ্ডীবের কাউকে আমি চিনতাম না। এখনো চিনি না। অবশ্য খোন্দকার আশরাফ হোসের সঙ্গে কিছু একটা পরিচয় আছে। দেখা-টেখা হলে একসঙ্গে কথা-বাত্রা বলি, চা-টা খাই, একবার কোলকাতাতেও একসঙ্গে পাশাপাশি ছিলাম। তবে সম্পর্কের গভীরতা নাই— এটা সত্য। তাছাড়া তিনি আশির দশকেরও না। ষাট থেকে ছিটকে আসা। প্রচলিত রাজনীতিতে তার বিশ্বাস আছে। গভীর অনুধ্যান ও সময় চেতনার মধ্য দিয়ে মানব জাতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তার কবিতা বা গদ্যে অনুপস্থিত। রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজের দুচারটি কবিতা পড়েছি— খারাপ লাগে নাই; মান্নান সৈয়দ বেঁচে থাকতে রিফাতের নাম নিতেন— এখন আর কেউ নামটাম নেয় না।

আমার মনে হয় আশি সবচেয়ে কম প্রতিভাবান একটি দশক। স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম প্রপাগান্ডিস্ট গ্রুপ। কবিতা না লিখে কবি খ্যাতির দিকে ছুটেছেন বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পঠন-পাঠনের গভীরতাও কম। গোমেজ নাকি কিছু পড়াশোনা জানে। আমার সঙ্গে অবশ্য কখনো দেখা হয় নাই। তবে তার প্রিয় কবির তালিকায় হুসাইন মুহম্মদ এরশাদও রয়েছেন। একটু প্রপাগান্ডিস্ট। ফেসবুকবাজিতে নাকি উস্তাদ। চলতি বছরের মাঝামাঝি মাসুদ খানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো। সোহেল হাসান গালিবরা তাকে আমার শ্যামলির ঠিকানায় নিয়ে এসেছিলেন কবিতা পড়াবার জন্য। এর আগে আমাদের দেখা হয়েছিলো বলে মনে হয় না। ওই আসরে শেষমেষ আমাদের বিদায় উষ্ণতাপূর্ণ ছিলো না। আমি নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করছিলাম; সেও অবশ্য কম যান নাই। আমি কখনো তার কবিতা ছাপা অক্ষরে পাঠ করে দেখি নাই। তবে ওইদিন সে গোটা বিশেক কবিতা পড়েছিলো। খারাপ লাগে নাই। তবে মোটেও শক্তিশালী কবি মনে হয় নাই। তবে আশির দশকে উল্লিখিতরা কিছুটা ভাগ্যবান এই জন্য যে, তাদের কিছু অপ্রতিভাবান কবি বন্ধু ছিলো— যারা কিছুটা মিডিয়া-মোগল— তারাই নানাভাবে তাদের প্রচারে সমর্থন জুগিয়েছেন।

আর আমি— আমার তো কবিজীবন টিকে থাকারই কথা নয়। প্রথম আলোর মতো প্রভাবশালী কাগজে যার একটি কবিতাও ছাপা হয়নি। সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদিত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতাতে যার জন্মই হয়নি— সেই কবির কি কোনো ইতিহাস আছে। এটা হলো ছুরিকাঁচির ইতিহাস— সব কেটে ফেলে দিতে চায়। এ কর্মের পেছনে তিনি একজন ভারতীয় বাঙালি কবির সহায়তা নিয়েছেন; এ কাজটি তার ভাই ফরিদ কবিরও করতেন; এখানকার কবিদের দমন করার জন্য বাইরের সাক্ষী মানতেন। অবশ্য ফরিদ কবির কবি হিসাবে তার অনুজের চেয়ে উত্তম। এ ধরনের বক্তব্যে আপনি আমাকে সংক্ষুব্ধ ভাবতে পারেন। কিন্তু আমার তো আর নতুন করে কিছু করার নেই। পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সকল প্রকৃত কবির মৃত্যু হয়ে থাকে। আমি প্রকৃত না হয়েও মারা গেছি। ধরুন ভবিষ্যতের কেউ যখন এ সময়ের কবিতার ডকুমেন্টস খুঁজবে তখন তো আমি নো-হোয়ার। মাহফুজামঙ্গল, বলউপাখ্যান, আপেল কাহিনী— এসব রচনার কি কোনো অর্থ আছে। তখন হয়তো একমাত্র মূল্যায়ন হবে মান্নাদের গানের ভেতরে— ‘একটি কবিতা তার হলো না কোথাও ছাপা, পেল না সে প্রতিভার দামটা।’

দেশভাগোত্তর দুই বাংলার কবিতায় মৌলিক কোনও পার্থক্য রচিত হয়েছে কি? এ-বাংলায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। ওপার বাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন— এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করেন?

মজিদ মাহমুদ: ছয় নং প্রশ্নের উত্তর পুরোটাই আপনার প্রশ্নের মধ্যেই রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বসিয়ে দিতে পারলেই হবে। আপনি কেন দেশ বিভাগের কথা বলছেন, তার আগেও কি এখানকার কবিতা আলাদা ছিলো না। কবিতা হলো কালের ইতিহাস। কবি মূলত সাল-উপাত্ত ছাড়াই এসব লিখে চলেন।

কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলুন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?

মজিদ মাহমুদ: এই প্রশ্নটিও খুব পুরনো। বুদ্ধদেব বসু সম্ভবত রেগেমেগে এটা নিয়ে একটা বই-ই লিখে ফেলেছিলেন— ‘কবিতার শত্রুমিত্র’। কবিতা অবশ্যই জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্বোধ্য শিল্প। ধরুন কবিতা লেখার জন্য তো প্রথমে আপনাকে লিখতে ও পড়তে জানতে হবে। আর যেই আপনি লেখাপড়া শিখলেন সেই আপনি অনেক-জন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। যে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো অক্ষর জ্ঞানের বাইরে— তখন আপনি কিভাবে বলবেন আপনি জনবিচ্ছিন্ন নন। কবিতার জন্য অবশ্যই এটা একটা ফালতু আলোচনা। কবিতা সব সময় তার শ্রেণীর মানুষের জন্য লেখা হয়; আর সমশ্রেণী ছাড়া অন্যরা তার কবিতা বুঝতেও পারে না বা পারতেও চায় না। ধরুন আপনি যাযাবর, তাবুতে বাস করেন— যেখানে জানালা আর দরোজা নাই— সেখানে কি আপনি জনগণের মধ্যে এই ধারণা দিতে পারবেন যে— বাতায়ন পাশে আপনার প্রেমিকা বসে আছে। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন এই আক্ষেপ করেছেন যে, নিম্নবর্ণের জন্য তার পক্ষে কবিতা লেখা সম্ভব নয়, কেননা তাদের জীবন ও ভাষা তো তার কাছে নেই। আপনি পুনশ্চ কাব্যের ‘ছেলেটা’ কবিতা পড়লেই জানতে পারবেন। তবে এক সময়— যখন একেবারেই মানুষের লিপিজ্ঞান ছিলো না, কিংবা ছাপাখানা আবিষ্কার হয়নি, তখন কবিরা শ্রোতার মনোরঞ্জনের জন্য তাদের বোধগম্য ভাষা ও মেটাফরে আশ্রয় নিতেন। কিন্তু সে যুগ বাসি হয়ে গেছে। প্রতি কবিই এখন খুঁজে বেড়ান একটু আড়াল করার জায়গা। কিন্তু সে জায়গা  এখন আর এতো সহজ নয়। ধরুণ আপনি ঢাকা শহরে পেচ্ছাপ করবেন; কিন্তু এতো মানুষের মধ্যে কোথায় আড়াল খুঁজে পাবেন। কবিতার ক্ষেত্রেও তাই— এতো কবি; অথচ নিশ্চল নাগরিক জীবন— একই রকম শারীরিক বেদনার পেছনে সবাই ছুটছে। বাণিজ্য আর ভোগের বাইরে তার আড়াল করবার কোনো জায়গা নাই। তাই সবাই একই কাজ করছেন। আর যে আড়ালে পেচ্ছাপ করতে পারছেন, সে তার সম্ভ্রম কিছুটা রক্ষা করতে পারলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন। যাক, তবু কবিতার জন্য কিছুটা আড়াল দরকার আছে।

।।
মজিদ মাহমুদ
জন্ম : ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬
জন্মস্থান : পাবনা, বাংলাদেশ
পেশা : সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, সমাজকর্ম (যখন যেটা জুটে যায়)
প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা : ৩০
কাব্যগ্রন্থ : ১১
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : মাহফুজামঙ্গল, বল উপাখ্যান, আপেল কাহিনী, ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম, গোষ্ঠের দিকে।
উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ : সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা, কেন কবি কেন কবি নয়, উত্তর উপনিবেশ সাহিত্য, ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ, নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র, রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ।
mozidmahmud@yahoo.com
।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*