রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

0
242

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ইংরেজি ভাষায়: Rooppur Nuclear Power Plant) হচ্ছে ২ হাজার ৪ শত মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রস্তাবিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে। ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহায়ক প্রকল্পের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কর্মকর্তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণসহ অত্যাধুনিক বাসস্থান গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের পরেই অর্থের অভাবে পরিত্যক্ত হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

অবস্থান
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ঈশ্বরদী উপজেলাধীন পাকশী ইউনিয়নে অবস্থিত। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ঈশ্বরদী উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ঈশ্বরদী উপজেলা সদর হতে প্রায় ৮ কিমি দক্ষিণে পাকশী ইউনিয়নে পদ্মা নদীর উপর সেতুটি অবস্থিত।

ইতিহাস
১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত ভারত সরকার অসম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে পদ্মা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে সেতু নির্মাণের মঞ্জুরী লাভের পর বৃটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইলস সেতুটি নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে সেতু নির্মাণের সমীক্ষা শুরু হয়। ১৯১০-১১ খ্রিস্টাব্দে পদ্মার দুই তীরে সেতু রক্ষার বাঁধ নির্মাণ হয়। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে সেতুটির গাইড ব্যাংক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পাশাপাশি সেতুর গার্ডার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গার্ডার নির্মাণের জন্য কূপ খনন করা হয়। ২৪ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ ৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। তাঁর নামানুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রীজ। সেতুটির নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৩২ হাজার ১ শত ৬৪ টাকা। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৮ শত ফুট। ব্রিজটিতে ১৫টি স্প্যান আছে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুটিতে বোমা ফেলা হলে ১২ নম্বর স্প্যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেগুলো পরে মেরামত করা হয়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ঈশ্বরদী ভেড়ামারা সীমানায় পদ্মানদীর উপর অবস্থিত। সেতুটি দিয়ে শুধু ট্রেন চলাচল করে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের শতবর্ষ পূর্ণ হয়। জানা যায়, এই সেতু তৈরি করতে ২৪ হাজার শ্রমিকের ৫ বছর সময় লেগেছিল।

রুপপুর প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোনসমূহ
১৯৬১
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

১৯৬২-১৯৬৮
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুর-কে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান হিশেবে নির্বাচন করা হয়। একাধিক সমীক্ষার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের যথার্থতা যাচাই করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ভূমি উন্নয়ন, অফিস, রেষ্ট হাউজ, বৈদ্যুতিক সাব-ষ্টেশন ও কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ কাজ আংশিক সম্পন্ন করা হয়।

১৯৬৯-১৯৭০
২০০ মেগা-ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়।

১৯৭২-১৯৭৫
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০০ মেগা-ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

১৯৭৭-১৯৮৬
মেসার্স সোফরাটম কর্তৃক পরিচালিত ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়।

একনেক কর্তৃক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১২৫ মেগাওয়াট) নির্মাণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৮৭-১৯৮৮
জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডের দুটি কোম্পানি কর্তৃক দ্বিতীয়বার ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। উক্ত স্টাডির মাধ্যমে প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরী যৌক্তিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ স্টাডিতে ৩০০-৫০০ মেগা-ওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

১৯৯৭-২০০০
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়া কর্তৃক ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ সময়ে মানব সম্পদ উন্নয়নসহ কিছু প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার এ্যাকশান প্লান-২০০০ অনুমোদিত হয়।

২০০৮
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়।

২০০৯
‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অপরিহার্য কার্যাবলী সম্পাদন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক কার্যাবলী ও পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়।

১৩ মে ২০০৯ তারিখে বংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশান ফেডারেশনের স্টেট এ্যটমিক এনার্জি কর্পোরেশন (রোসাটোম)-এর মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

২০১০
২১ মে ২০১০ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক Framework Agreement স্বাক্ষরিত হয়।

প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি, মাননীয় মন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাপতিত্বে কারিগরি কমিটি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ও ৮টি সাবগ্রুপ গঠন করা হয়।

১০ নভেম্বর ২০১০ তারিখে মহান জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক মি: ইউকিআ আমানো বাংলাদেশ সফর করেন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএইএ থেকে সকল ধরণের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

২০১১
৯-১৫ নভেম্বর ২০১১ সময়ে বাংলাদেশের পারমাণবিক অবকাঠামোর সার্বিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য IAEA Integrated Nuclear Infrastructure Review (INIR) mission পরিচালিত হয়।

২ নভেম্বর, ২০১১ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তরাষ্ট্রিয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১২
১৯ জুন ২০১২ তারিখে Bangladesh Atomic Energy Regulatory Act-2012 পাশ করা হয়।

২০১৩
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাশান ফেডারেশন সফরকালে (১৫ জানুয়ারী ২০১৩) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের Preperatory stage of construction কার্যাদি সম্পাদনের জন্য State Export Credit চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

স্বাক্ষরিত আন্তরাষ্ট্রীয় চুক্তি (IGA) এবং State Export Credit Agreement-এর ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন (১ম পর্যায়) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

২ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

২০১৪-২০১৫
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের Operating Organization প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিধান সম্বলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইন, ২০১৫ জারী করা হয়।

১৮ আগস্ট ২০১৫ তারিখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার জন্য Nuclear Power Plant Company Bangladesh Limited (NPCBL) গঠন করা হয়।

২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়ের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য General Contract for Rooppur Nuclear Power Plant Construction স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৬
১০-১৪ মে ২০১৬ সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পারমাণবিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়ে IAEA-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন অগ্রগতি রিভিউ করার জন্য INIR follow-up mission পরিচালনা করা হয়।

২১ জুন ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের Site Licence প্রদান করা হয়।

২৬ জুলাই, ২০১৬ তারিখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিষয়ে রাশান ফেডারেশন ও বাংলাদেশ পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত Joint Coordinating Committee (JCC)-এর একটি সভা গত ২২ জুন ২০১৬ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট Spent nuclear fuel management, nuclear fuel supply এবং operation and maintenance সংক্রান্ত Contract -এর বিষয়ে কতিপয় গরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*