ঈশ্বরদীর ‘নৌকা মান্নান’-‌এর যাপিত জীবন

0
1527

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী// জীবনভর রং-বেরঙের নৌকা বানিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা প্রকাশের এক অনন্য নজীর স্থাপন করেছেন ঈশ্বরদীর নৌকা মান্নান। যিনি একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে মু্িক্তযুদ্ধ করেছেন, পাকিস্তানি আর্মি, অবাঙালী বিহারী, আলবদরসহ অসংখ্য রাজাকারদের নিজ হাতে হত্যা করেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছর পরও তিনি পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। এলাকার সবাই তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানলেও আব্দুল মান্নান (৬২) এখনো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। এতে তার মনে অনেক আপে আছে, কিন্তু বয়োবৃদ্ধ এই মান্নান এখনো কারো কাছে মাথা নত না করে নিজ হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর নৌকা’ বানিয়ে জীবন সংগ্রাম করে চলেছেন। এই নৌকাই তার জীবনের প্রধান অবলম্বন।

আব্দুল মান্নান ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়াগোপালপুর গ্রামের মৃত মহব্বত আলী চৌধুরীর ছেলে। তিনি জানান, ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিয়ের মাত্র ৬/৭ দিন পর ঘরে নববধুকে ফেলে তিনি যুদ্ধে চলে যান। ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধে অংশগ্রহনের সময় কোম্পানী কমান্ডার কাজী সদরুল হক সুধা, কমান্ডার জন, গ্র“প লীডার জিয়াউল এর সাথে থেকে তিনি যুদ্ধ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দিয়ে কখনো রিকশা চালক হয়ে, কখনো দিনমজুরী করে, সাইকেল রিকশা মেরামতের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন।

এখন থেকে প্রায় ২০ বছর আগে তিনি শখ করে টুকরো টিন দিয়ে তার প্রিয় প্রতীক একটি নৌকা বানানোর পরে নৌকা বানানোর নেশায় পেয়ে বসে তাকে। এরপর থেকে তিনি ছোট ছোট নৌকা বানিয়ে নিজের ছোট্ট দোকানঘরে সাজিয়ে রাখতেন। এক পর্যায়ে আওয়ামীলীগের কোন জনসভা হলে কিংবা কোন নেতাকে উপহার দেওয়ার জন্য স্থানীয় ছোট খাটো নেতারা তার কাছ থেকে এসব নৌকা ক্রয় করতে এলে প্রথমে তেমন একটা গুরুত্ব না দিলেও পরবর্তি সময়ে এই ‘শো পিস’ নৌকা এখন তাকে এলাকায় ‘নৌকা মান্নান’ হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে। তার হাতে তৈরী প্রচুর নৌকা দেশের অনেক মন্ত্রী ও নেতাদের শোকেসে শোভা পাচ্ছে।

এই নৌকা বানিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনভাবে জীবন যাপন করছেন একাত্তরের অদম্য সাহসী যোদ্ধা আব্দুল মান্নান। আব্দুল মান্নান বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন খুবই কষ্টে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এই আব্দুল মান্নান জানান যখন কোন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে তার সামনে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেতে কিংবা ভাতাসহ সরকারী সুযোগ-সুবিধা পেতে দেখেন তখন তার ভীষন কষ্ট হয়। তিনি বলেন, যখন কোন রাজাকারকে দেখি স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছেন বীরদর্পে তখন চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারিনা। আব্দুল মান্নানের সঙ্গে তার ছোট্ট দোকান ঘরের সামনে বসে কথা বলার সময় কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তিনি বলেন অস্ত্র জমা দেওয়ার কাগজপত্র নিয়ে ৩ বার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে ফরম পুরণ করে আবেদন করা হলেও এখনো তার ভাগ্যে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি জোটেনি। আব্দুল মান্নান বলেন, তার নিজ গ্রাম এই সাঁড়াগোপালপুরেই ২/৩ জন আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাস্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন।

ঈশ্বরদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে খোঁজ নিয়ে জানা যায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে ‘আবেদন যথাযথভাবে দাখিল হয়েছে (নং-ডিজিআই ১০১২৮৭)’ বলে একটি কাগজ এসেছে কিন্তু এখনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম ওঠেনি। ইতিপূর্বে সারাদেশে এ ধরনের ১৭২ জনের নামের তালিকা করা হলেও সে তালিকা এখনো আলোর মুখ দেখেনি বলে জানান ঈশ্বরদীর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক। ঈশ্বরদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাহী সদস্য গোলাম মোস্তফা চান্না মন্ডল এ প্রসঙ্গে বলেন আব্দুল মান্নান একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু তার নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না হওয়ায় তারাও বারবার বিব্রত হচ্ছেন। এলাকার মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার কামরুজ্জামান জানান, আব্দুল মান্নান তাদের সঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তিনি আব্দুল মান্নানের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় এখনো অন্তর্ভূক্ত না হওয়াটা খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। মুক্তিযুদ্ধে জয়ী ও জীবন যুদ্ধে অনেকটাই পরাজিত আব্দুল মান্নান বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ছাড়া আর কিছু চাওয়ারও নেই তার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

*