মজিদ মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

0

মজিদ মাহমুদ। বাংলা সাহিত্যের এক নক্ষত্র। কবি ছাড়াও তিনি একাধারে  গবেষক, সাংবাদিক, সমাজসেবক হিসেবও সমান পরিচিত। তাঁর ভাষা ও আঙ্গিকের গতিময়তা সমকালীন বাংলা কবিতার জড়ত্বের মধ্যে আলাদা করে চেনা যায়।

সানোয়ার বেগম ও মোহাম্মদ কেরামত আলী বিশ্বাসের দশম সন্তান। মজিদ জন্মেছিলেন ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি নামক গ্রামে; পাবনা জেলাসদর থেকে ১৩ কি.মি. পশ্চিমে। তাঁর শিক্ষা-জীবন শুরু হয় স্থানীয় স্কুল-কলেজে। পরবর্তীকালে তিনি গোপালচন্দ্র ইনসটিটিউট (জিসিআই) পাবনা, রাধানগর মজুমদার একাডেমী (আরএমএ) পাবনা, শহীদ বুলবুল কলেজ পাবনা, এডওয়ার্ড কলেজ পাবনা, শহীদ নূরুল ইসলাম কলেজে অধ্যায়ন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পাঠ অসমাপ্ত রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণের জন্য রাজধানীতে আসেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। মজিদ মাহমুদ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোলোজিতে এমএ করছেন।

প্রকাশনা:
রাজধানীতে আসার আগেই ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে কলেজ পড়াকালে তাঁর প্রথম বই ‘বউটুবানী ফুলের দেশে’ প্রকাশিত হয়। পরের বছর একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়, ‘মাকড়সা ও রজনীগন্ধা’ (১৯৯৬); ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে ‘মাহফুজা মঙ্গল’ প্রকাশের পরে মজিদ মাহমুদ কাব্য- পাঠকের দৃষ্টি কাড়তে বাধ্য করে। তাঁর ভাষা ও আঙ্গিকের গতিময়তা সমকালীন বাংলা কবিতার জড়ত্বের মধ্যে আলাদা করে চেনা যায়। এরপর মজিদ মাহমুদের যাত্রা থেমে থাকেননি; তবু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর কৃপণতা লক্ষ্য করা যায়। ‘মাহফুজা মঙ্গল’ প্রকাশের সাত বছর পরে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় ‘গোষ্ঠের দিকে’ (১৯৯৬); তারও পাচঁ বছর পরে প্রকাশিত হয় ‘বল উপাখ্যান’ (২০০১)। ‘বল উপাখ্যান’ বাংলা কবিতার কিঞ্চিত স্বাতন্ত্র্য সংকলন বলে উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হয় না। ২০০২ সালে ‘আপেল কাহিনী’ নামে অপর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মাহফুজামঙ্গল, বলউপাখ্যান ও আপেল-কাহিনী এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ মিলে মজিদ মাহমুদের একটি চেতনা-বলয় তৈরি হয়। বাংলা কবিতার বিষয়-চৈতন্যের ক্ষেত্রে তার এ কাব্যত্রয় বাংলা-সাহিত্যের নতুন সম্প্রসারণ। ২০০১ সালে মাহফুজামঙ্গল দ্বিতীয় সংস্করণ এবং ২০০৪ সালে মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ডসহ তৃতীয় ও অখন্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২০০৬ সালে তাঁর ‘নির্বাচিত কাব্য-সংকলন’ প্রকাশিত হয়।

গবেষণা কার্যক্রম:
গবেষক হিসেবেও মজিদ মাহমুদের প্রাতিস্বিকতা প্রতিষ্ঠিত। ১৯৯৬ খিস্টাব্দে মজিদ মাহমুদ নজরুল ইনসটিটিউটের নজরুল গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। সেই গবেষণা কর্মের ফসল ‘নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ (১৯৯৭); একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে’র ফেলো। ২০০০-২০০১ দু‘বছরের বৃত্তি নিয়ে তিনি কাজ করছেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ সাহিত্য বিষয়ে। ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ‘নজরুলের মানুষধর্ম’ (২০০৪), ‘কেন কবি কেন কবি নয়’ (২০০৩) এবং ‘ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ-প্রবন্ধ’ নামে চেতনা-উদ্যেগকারী তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

সম্পাদনা:
‘বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা’ (২০০০) শিরোনামে বাংলা সাহিত্যের বৃক্ষ বিষয়ক কবিতা নিয়ে তিনি একটি কবিতা সংকলন করেন। মাইকেল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এই সংকলনের ব্যাপ্তি। সংকলনটি পাঠক সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। Bangla Literature নামক একটি অর্ধ-বার্ষিক জার্নালের সম্পাদক তিনি। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে তিনি ‘পর্ব’ নামে একটি সাহিত্য-চিন্তার কাগজ সম্পাদনা করে আসছেন। মজিদ মাহমুদ তাঁর অকাল-প্রয়াতবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবি ও গবেষক জামরুল হাসান বেগ স্মরণে একটি স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।
এ ছাড়া সংবাদ সাময়িকী ও জার্নালে ছড়িয়ে রয়েছে তার অসংখ্য উল্লেখযোগ্য রচনা।
চাকরি জীবনের শুরুতে তিনি মুড়াপাড়া ডিগ্রী কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। তবু বলা চলে সাংবাদিক হিসাবে মজিদ মাহমুদের পেশা জীবন শুরু ও ব্যাপ্তি। তিনি সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম ‘দৈনিক বাংলা’র সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭-এর পরে তৎকালীন সরকার কাগজটি তাদের নির্বাচনী মেনোফেস্টো হিসাবে বন্ধ ঘোষণা করলে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। সেই সময়ে তিনি কিছুদিন কলেজে শিক্ষকতা ও একটি বেসরকারী সংস্থায় কাজ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-র উর্ধ্বতন সহ-সম্পাদক হিসাবে কর্মরত।
সংগঠক হিসেবেও মজিদ মাহমুদের সফলতা রয়েছে। তিনি ১৯৮৬ সালে পাবনায় ‘বন্দে আলী স্মরণ পরিষদ’ নামে একটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি তার জন্মস্থান চরগড়গড়িতে শিশুদের জন্য একটি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া ওই প্রত্যন্তগ্রামে তিনি আধুনিকমানের একটি গ্রন্থাগার গড়ে তুলছেন। এ ছাড়া ওসাকা নামের একটি বেসরকারী সংস্থারও তিনি প্রতিষ্ঠাতা।
মজিদ মাহমুদ জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, রাইটার্স ক্লাব ও বাংলা একাডেমীর সদস্য।

পুরস্কার:
তিনি তার সাহিত্য কর্মে উলেস্নযোগ্য অবদানের জন্য এ পর্যন্ত বেশকিছু পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। কবি মজিবুর রহমান বিশ্বাস স্মৃতি-পুরস্কার, কবি মকবুল হোসেন স্মৃতি-পুরস্কার, কবি মঞ্জুষদাশ স্মৃতি-পুরস্কার, সৌহার্দ্য’৭০ কোলকাতা, অনিরুদ্ধ ৮০ কোলকাতা, হলদিয়া কবিতা উৎসব পশ্চিমবঙ্গ, ঈশ্বরদী জনকল্যাণ সমিতি সম্মাননা।